পর্ব-১ পর্ব-২ | পর্ব-৩ | পর্ব-৪ | পর্ব-৫ | পর্ব-৬ | পর্ব-৭ | পর্ব-৮ | পর্ব-৯ |

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

ফ্লোরিডার রাজধানী ট্যালাহাসি ছেড়ে জর্জিয়া আর আলাবামার পাশ ঘেঁষে যখন পেনসাকোলার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, তাকিয়ে দেখি ঘড়ির কাঁটা একঘন্টা পিছিয়ে গেছে! ঠাহর হল যে বাড়ি ছেড়ে প্রায় পাঁচশ মাইল দূরে চলে এসেছি। আসলে এখানে যানজট না থাকায় আর মসৃণ রাস্তার উপর ঘন্টায় প্রায় আশি মাইল বেগে গাড়ি চলার কারণে বোঝাই যায়না যে কখন এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ফেললাম! গাড়ি মামুন ভাই একাই ড্রাইভ করে চলেছেন। যদিও মাঝে মাঝে তানভীর ভাইকে চালাতে দেয়ার কথা; কিন্তু জানালেন উনি ক্লান্ত নন!

পেনসাকোলা বীচে যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। সৈকতটা বেশ ছোট, চারিদিকে ময়লা-আবর্জনার মত মরা জলজ গাছ পড়ে আছে। আমরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম- এত নাম শুনলাম; আর এই হল সেই পেনসাকোলা বীচ! দেখার মত বলতে আশেপাশে অনেক কাঁশফুল। ওগুলোর পাশেই বিভিন্ন পোজে সবাই ছবি তুলে নিলাম। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে, রাতে কোথাও থাকার জায়গা ঠিক করা দরকার। সাগরসংলগ্ন এলাকাতে অনেকগুলো নামিদামী হোটেল চোখে পড়ল। দেখেই বোঝা যায় বেশ বিলাসবহুল। আসলে ফ্লোরিডার মার্কেট বা হোটেলগুলোর মূল টার্গেট ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্টরা। চারপাশে এত বীচ আর ডিজনী ওয়ার্ল্ডের মত থিম পার্ক থাকার কারণে বছরের সবসময়ই এখানে ট্যুরিস্টদের ভিড় লেগে থাকে আর সেই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও চড়া দামে সবকিছু গছিয়ে দেয়। ওয়ায়েস ভাই একটা হোটেলে ঢুকে জেনে আসলেন যে মাত্র একরাতের জন্য একটা রুম নিলেই তাতে দু’শ ডলার বেরিয়ে যাবে! রাতে ঘুমাবো হয়ত ৫-৬ ঘন্টা, এর জন্য এত খরচ করতে মন সায় দিচ্ছিল না। একজন প্রস্তাব করল সমুদ্র সৈকতেই রাত কাটিয়ে দিলে কেমন হয়? পরক্ষণেই নাকচ হয়ে গেল, মাত্রই দেখে আসলাম অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে ওখানে মশাও বাড়ছে! অরল্যান্ডোতে ফোন করে মাঈনুল ভাইকে অনুরোধ করলাম ইন্টারনেটে দেখতে আশেপাশে সস্তা টাইপের কোন হোটেল আছে কি না। উনি বেশ কয়েকটা ফোন নম্বর দিলেন। আমি ফোন করে করে প্রতিটাতে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম রুম খালি আছে কি না বা খরচ কেমন। আবিষ্কার করলাম, রুম ভাড়া সমুদ্রপাড় থেকে হোটেলের দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক। সুতরাং দূরে গিয়ে কোন হোটেলে ওঠাই লাভজনক।

মোটামুটি আধঘন্টা ড্রাইভ করে যে হোটেলটা পেলাম সেটার খরচ আগেরগুলোর তুলণায় বেশ কমই- সত্তুর ডলার। খুশি হয়ে গাড়ি থেকে সবাই বের হচ্ছি, তখন মামুন ভাইয়ের মনে পড়ল যে ওরা আমাদের পাঁচজনকে একরুমে থাকতে দিবে না। বলবে একজনের জন্য আরেকটা রুম নিতে। আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন- মাত্র ছয় ঘন্টা ঘুমানোর জন্য এত ভাড়া দিব? ফন্দি করা হল পঞ্চম ব্যক্তি সবার সাথে ঢুকবে না; পরে স্থানীয় অতিথি দেখা করতে এসেছে এমন একটা ভাণ করে ঢুকবে। মামুন ভাই আশ্বাস দিলেন হোটেলগুলোতে এই কান্ড হরহামেশাই হয়। অপু ভাই গাড়িতে রয়ে গেলেন। উনি নিজের ইচ্ছায় রইলেন নাকি আমরা চাপিয়ে দিয়েছিলাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। আমরা চারজন আইডি দেখিয়ে রুম বুঝে নিলাম। পরে দেখা গেল রুমটাতে বাইরে দিয়েই যেতে হয়; এত লুকোচুরির কিছু নেই। ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বার্গার আর পানি নিয়ে একেবারে রুমে ঢুকে গেলাম যেন রাতে আর খাবারের জন্য নামতে না হয়। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর সুযোগ পেয়ে লাইন ধরে গোসলের ধুম পড়ল। অপু ভাইকে বেশ কয়েকবার আশ্বাস দেয়ার পরও উনি উশখুশ করতে লাগলেন। নিয়ম লঙ্ঘন করে রুমে পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে থাকাটাই এর কারণ। তার উপর একটা ভয় ছিল ওরা যদি রুম চেক করতে চলে আসে যে আমরা চারজনই উঠেছি কি না! একটু পরে রুমে ইন্টারনেট না পেয়ে আমি লবিতে রিসেপশনিস্টের কাছে ফোন করলাম। মেয়েটা জানালো যে দুইদিন ধরে এই রুমে ইন্টারনেট কাজ করছে না। বেশ লজ্জিত হয়ে বারবার দুঃখও প্রকাশ করল এর জন্য। আর আমিও সুযোগ পেয়ে এমন একটা অসন্তোষ নিয়ে ফোন রাখলাম যে ওরা ভুলেও আর এই রুম চেক করতে আসার কথা ভাববে না। অপু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আর ভয় নাই। রুমে নেট নাই- এই লজ্জাতেই ওরা আমাদের সামনে মুখ দেখাবে না। আপনি শান্তিতে ঘুমান।’

ভোর ছ’টার মধ্যেই আবার বেড়িয়ে পড়লাম। রোডট্রিপ বলে কথা, যত বেশি সম্ভব রাস্তায় রাস্তায় কাটানো উচিৎ। আবারও একটা গ্রোসারীতে ঢুকে ব্রেড, কলা, কেক এইসব কিনে খেয়ে নিলাম। পেনসাকোলা এসেছিলাম আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে, আর ফেরত যাওয়ার প্ল্যান গালফ্ অব মেক্সিকো’র পাশ দিয়ে। মামুন ভাই হাইওয়েতে ড্রাইভ করার সময়ই কী করে যেন বুঝে যান কোন জায়গায় থামলে সুন্দর একটা বীচ পাওয়া যাবে। সকালটা শুরু হল একটা লেকের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে। লেক না ঠিক; সাগরের ছোট একটা অংশ। দুই বৃদ্ধ মাছ ধরছে, পাশে তাদের কুকুর। তাদের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। অনেক দূরে একটা ভাঙ্গাচোড়া কাঠামো দেখা যাচ্ছিলো। জানা গেল ওটা প্রায় শতাধিক বছরের পুরোনো জেটি। আগে ওখানে স্প্যানিশদের জাহাজ ভিড়তো, মালামাল আসতো। দুই বৃদ্ধের কাছ থেকে আশেপাশের বীচগুলোর অবস্থাণ জেনে নিয়ে আবার আমরা রাস্তায় নেমে পড়লাম।

সকাল আটটার দিকে নেমে পড়লাম নাহ্‌ভার বীচে। মজার ব্যাপার হল ফ্লোরিডার সবগুলো বীচের সামনেই সাইনবোর্ডে লেখা থাকে যে ওটাই ফ্লোরিডার/আমেরিকার/পৃথিবীর সেরা সমুদ্র সৈকত! এখানেও এমনই একটি বাণী দেয়া- ‘ফ্লোরিডার সেরা জিনিসগুলো এই বীচে লুক্কায়িত!’ এই সৈকতেও নেমে দেখি কিছু মানুষ মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে খোঁজাখুঁজি করছে। কি খুঁজছে আর কিইবা পাচ্ছে, গতকাল থেকেই এ প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরছে। কিছুক্ষণ পাড় বরাবর হাঁটাহাঁটি করে কাঠের একটা ব্রীজে উঠলাম যেটা সাগরের দিকে অনেকদূর পর্যন্ত গিয়েছে। ওটাতে উঠতে আবার টিকেট লাগছে। পরে কারণটা বুঝতে পারলাম- আমরা গিয়েছি কেবল দেখতে; আর অন্যরা সবাই গিয়েছে মাছ ধরতে! হরেক রকমের ছিপ-বড়শি নিয়ে এই সাতসকালেই শৌখিন মৎস্যশিকারিরা চলে এসেছে পরিবার নিয়ে। তার উপর সেদিন ছিল রবিবার। ছোট ছোট শামুক টোপ হিসেবে ব্যবহার করে ছোট মাছ ধরছে, আবার সেই ছোট মাছকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে বড়শিটা একটু দূরে ফেলে বড় মাছ ধরছে। সব মাছ যে নিচ্ছে তাও না; পছন্দ না হলে আবার ছেড়ে দিচ্ছে। দেখে মনে হল মাছ পাওয়ার চেয়ে এখানে সময় কাটানোতেই বেশি আনন্দ পাচ্ছে তারা…

    

(নাহ্‌ভার বীচে শৌখিন মৎস্যশিকারিরা)

ওখানে থেকে বের হয়ে যে রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেটাকে আমাদের এই রোডট্রিপের সেরা রাস্তা বলা যেতে পারে। সাঁপের মত এঁকেবেঁকে সামনে চলেছে আর দুইপাশে সাদা রঙের বালি। এত সাদা বলেই এটাকে সুগার-স্যান্ড বলে। আশপাশটা মরুভূমির মত- কোন গাছপালা নেই, দূরে মরীচিকা সৃষ্টি হচ্ছে। হলিউডের মুভিগুলোতে মেক্সিকোর দিকে যাওয়ার সময় যেমন রাস্তা দেখায়, অনেকটা সেরকম! আমরা সমানে দুইপাশের ছবি তুলে যাচ্ছি আর ভাবছি এই সুন্দর রাস্তাটা যেন শেষ না হয়ে যায়। এভাবে ত্রিশ মিনিট ধরে প্রায় বিশ মাইল চলার পর বড় একটা সাইনবোর্ড আর বীচ দেখে গাড়ি পার্ক করলাম। নেমে দেখি সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা ‘ওয়েলকাম টু পেনসাকোলা বীচ’। আমরা হা করে তাকিয়ে রইলাম! তাহলে গতকাল সন্ধ্যায় যেখানে ফটোসেশন করে আসলাম ওটা কোন বীচ ছিল? পরে বাসায় এসে গুগল ম্যাপ্‌সে দেখে বুঝেছি যে প্রথমদিন আমরা আসলে পেনসাকোলা উপসাগরের পাড়ে নেমেছিলাম। আর আজ খুঁজে পেলাম গালফ্ অব মেক্সিকো’র পাড়ে আসল পেনসাকোলা বীচ

(পেনসাকোলা বীচে যাওয়ার পথে…)

 

(পেনসাকোলা বীচ)

বীচে ঢোকার মুখে দেখা গেল পাশাপাশি কয়েকটা গাড়ি পার্ক করে একটা মুসলিম পরিবার আস্তানা গেড়েছে। বোধহয় ওরা সকালেই এসেছে, সারাদিন পানিতে কাটিয়ে এখন ফেরত আসছে গাড়ির কাছে। দলে কয়েকজন পুরুষ, বোরখা পরা কিছু মহিলা আর তাদের ছেলেমেয়ে। মামুন ভাই দূর থেকে তাদেরকে সালাম দিলেন। আমেরিকার একটা বীচে বোধকরি ওরা সালাম আশা করেনি। দাঁড়িওয়ালা বৃদ্ধ একটা লোক বেশ খুশি হয়ে আমাদের কাছে আসলেন। সবার সাথে পরিচিত হয়ে আলাপ জুড়ে দিলেন। জানা গেল এটা মিশরীয় পরিবার। এই বৃদ্ধ তার ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি-নাতনীদের নিয়ে আলাবামাতে থাকেন। প্রায়ই ছুটির দিনগুলিতে এখানে চলে আসেন। স্থানীয় মসজিদের ঈমাম তিনি। ছেলে ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার প্রফেসর। আমরা কেউ মাস্টার্স স্টুডেন্ট, কেউ পিএইচডি স্টুডেন্ট, কেউ রিসার্চার, কেউ ডেন্টিস্ট শুনে খুব খুশি হয়ে গেলেন আর আদর করে পিঠ চাপড়ে দিতে লাগলেন। আলাপের এক পর্যায়ে বললেন, আমরা সমুদ্রস্নান শেষে যেন তাদের সাথে এসে দুপুরের খাবার খাই। খাওয়ার জন্য আমাদেরকে এত করে ধরলেন যে না করতে পারলাম না!

এখানে পানি একদম স্বচ্ছ। ওয়ায়েস ভাই আর থাকতে পারলেন না, পানিতে নেমেই পড়লেন। আমি হাঁটুপানিতে রইলাম, সামনে সারাদিন পড়ে আছে তাই ভিজলে সমস্যা। আধঘন্টা পর এসে দেখি ওরা একটা টেবিলে বাসা থেকে রান্না করে আনা সব আইটেম সাজিয়ে রেখেছে। আমাদেরকে দেখে মেয়েগুলো গাড়ির আড়ালে চলে গেল। টিনেজার হলেও তাদেরকে পরিবার থেকে বোরখা পড়ানোর অভ্যাস করানো হয়েছে। একজন মহিলা (সম্ভবত মেয়েদের মা) আমাদের দিকে প্লেট এগিয়ে দিলেন আর অনুরোধ করলেন আমাদের যা যা ভাল লাগে টেবিল থেকে যেন নিয়ে খাই। রোডট্রিপের শুরু থেকেই আমরা ম্যাকডোনাল্ডস আর সাবওয়ের ভাজাপোড়ার উপরই ছিলাম। তাই গত ত্রিশ ঘন্টায় সবাই বেশ ক্ষুধার্ত, তাছাড়া ঘরের খাবারের প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ তো আছেই। কিন্তু আমরা পাঁচজন যুবক যদি উদরপূর্তি করে খাওয়া শুরু করি তাহলে এই টেবিলের উপর রাখা সব খাবারই শেষ হয়ে যেতে বাধ্য! এই মহিলারা আর মেয়েগুলো তখনো খাওয়া শুরু করেনি, আমাদের কথা ভেবেই। তাই আমরাও তাদের কথা ভেবে এবং সৌজন্য করে সবকিছু একটু একটু করে টেস্ট করে দেখলাম। আইটেমের মধ্যে ছিল মিডল ইস্টের বিখ্যাত রাইস, যার মধ্যে ওরা বাদাম, আখরোট, আলু বুখারা ইত্যাদি রাজ্যের জিনিস মিশিয়ে দেয়। একবার রাইসের মধ্যে সেমাইও পেয়েছিলাম! এখানে রমজান মাসে মসজিদে ইফতারের কল্যাণে অনেক ধরণের মিডল ইস্টের খাবারের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। ওদের আরেকটা বিখ্যাত জিনিস হল সালাদ- এটাও নানাবিধ শাকসবজির মিশ্রণ। তো সেদিন রাইস, সালাদের সাথে ছিল চিকেন আর অনেক রকমের (নাম না জানা) বেক করা আইটেম। সবকিছু একটু একটু করে নিয়েও আমাদের ভালই পেট ভরে গেল। আর খেতে খেতে বৃদ্ধ ঈমাম আর তার ছেলেদের সাথে গল্পগুজব তো চলছেই। চলে আসার আগে আমাদেরকে ফ্লাক্স থেকে বের করে চা’ও খাওয়ালো। খাবার খুব ভাল লেগেছে জানানোর পর মহিলাটি বললেন, ‘মেক দু’আ ফর আস’। আরও কয়েকবার ওদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম। অতি সাধারণ একটা ‘সালাম’ কত সহজে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে তা প্রথমবারের মত উপলব্ধি করলাম সুদূর এই আমেরিকায় এসে!

সেদিন অনেক গরম পড়েছিল, মাথার উপর বিখ্যাত ফ্লোরিডা সান! আধঘন্টা পরপরই কুলার থেকে গেটোরেডের বোতল বের করে সাবাড় করছি। এই জিনিস না থাকলে সেদিন কড়া রোদ মাথায় করে এতগুলো বীচে ঘুরে বেড়ানো অসম্ভব হয়ে যেত। নাহ্‌ভার বীচে থাকতেই স্থানীয় এক আমেরিকানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এদিকে আর কোথায় ভাল বীচ আছে? সে সাথে সাথে বলে উঠল, ‘গো টু ডেস্টিন বীচ। আলটিমেট ফান!’ ওখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম কেন এটা অন্যান্য বীচের চেয়ে ভিন্ন- সমুদ্র সৈকত ছাড়াও এখানে ছোটখাটো একটা জেটির মত করে সারি সারি অনেকগুলো বোট বাঁধা। বোটগুলো বিশাল সাইজের। চাইলেই এখানে থেকে যেকোন একটা ভাড়া করে সাগরে চলে যাওয়া যায়। আমার এক বন্ধু আছে আন্ড্রু, তার কাছ থেকে জেনেছি- মাছ ধরায় দক্ষ এমন কয়েকজন বন্ধু মিলে একদিনের জন্য এই বোটগুলো ভাড়া নেয়, তারপর সারাদিনে যা মাছ পায় সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেয়। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই মাছ কি বাজারে বিক্রি কর?’ জবাবে সে বললো, ‘না সব রান্না করে খাই। তোমাকেও একদিন বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়াব।’ এই বোট, জেটি ছাড়াও ডেস্টিনে স্যুভেনিরের একটা মার্কেটও দেখলাম। মোটামুটি পুরো এলাকাটাই রমরমা।

 

(ডেস্টিন বীচ)

(ইনলেট বীচ)

ডেস্টিন থেকে বের হয়ে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে হেন্ডারসন বীচ, আরও ত্রিশ মাইল দূরে ইনলেট বীচ এবং সেখান থেকে আরও পঞ্চাশ মাইল ড্রাইভ করে মেক্সিকো বীচে নামলাম। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি বীচেই নেমে কেবল পা ভিজানো, একেকটা বীচ স্পর্শ করা যেন গেমের একেকটা পয়েন্ট! তাছাড়া মামুন ভাইয়ের আগ্রহের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। দেখা গেছে আমরা ক্লান্ত হয়ে কিংবা গরমের ভয়ে গাড়ির ভিতর থেকে নামতে চাচ্ছি না; কিন্তু এতটা পথ ড্রাইভ করা সত্ত্বেও বারবার গাড়ি থামিয়ে বীচ পরিদর্শনের উৎসাহে তার বিন্দুমাত্র আলসেমি নেই! মেক্সিকো বীচে ঢোকার মুখেই একজনকে কাছে পেয়ে গেলাম যে কি না গভীর মনোযোগ দিয়ে ঘাসের উপর মেটাল ডিটেক্টর চালাচ্ছে। বয়স পঞ্চাশের উপরতো হবেই। মাথায় কাউবয় হ্যাট, চোখে সানগ্লাস, পরণে সাদা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিছু পেলে?’ জবাবে সে মাথা নেড়ে বললো, ‘নাহ্‌! সিগন্যাল পেলেই খুঁড়ে দেখি কোক-পেপসির বোতলের ক্যাপ।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা কি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আংটি-কানের দুল এগুলো খোঁজো?’ জবাবে আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে বললো, ‘নাহ্‌ ঐগুলোর প্রতি আমার আকর্ষণ নেই।’ জানা গেল তাদের পাঁচজনের একটা দল আছে, কেউ স্থপতি, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উকিল, কেউ ব্যবসায়ী। আর এই ‘মেটাল’ খোঁজা তাদের শখ। কয়েকশ বছর আগে সোনার বার বোঝাই কিছু স্প্যানিশ জাহাজ নাকি গালফ্ অব মেক্সিকোতে ডুবে গিয়েছিল যার হদিস পরে আর পাওয়া যায়নি। তাই ওগুলো সারাজীবন ধরে খুঁজে যাচ্ছে একদল মানুষ। একটা মাত্র সোনার বার মিললেই কোটিপতি!! সেই আশায় বুক বেঁধেই দিনের পর দিন এই কাজ করে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম তাদের ধৈর্যশক্তি দেখে! কথাবার্তার একপর্যায়ে আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে লাফ দিয়ে উঠলো। বললো, ‘আমি জর্জ হ্যারিসনের বিশাল ভক্ত। তাঁর কনসার্ট ফর বাংলাদেশে আমি উপস্থিত ছিলাম। ঐ ক্যাসেটটাও অনেক যত্ন করে রেখে দিয়েছি।’ শুনে মনটা ভাল হয়ে গেল। তার সাথে আমরা কিছু ছবি তুললাম। চলে আসার সময় সে বললো ইদানিং স্প্যানিশ শেখার চেষ্টা করছে।পুরনো কিছু স্প্যানিশ নথিপত্রে ঐ জাহাজগুলোর অবস্থাণ বা গন্তব্য সম্পর্কে লেখা আছে বলে সে মনে করে। আমরাও তার সৌভাগ্য কামনা করে আর একদিন সে কোটিপতি হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে বিদায় নিলাম।

(শৌখিন স্বর্ণশিকারী। পেশায় নৌ-প্রকৌশলী। জর্জ হ্যারিসনের সৌজন্যে বাংলাদেশকে খুব ভাল করে চেনেন এই আমেরিকান। পাশে মামুন ভাই)

এই সবগুলো বীচই পড়ছিল আমাদের বাড়ি ফেরার পথের দিকে, তাই একটু পরপর গাড়ি থামিয়ে নামলেও সমস্যা নেই। তাছাড়া মামুন ভাইয়েরও রেস্ট নিয়ে নিয়ে ড্রাইভ করা হচ্ছে। সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে সেইন্ট যোসেফ পেনিনসুলা স্টেট পার্কে ঢুকে গেলাম। দুইদিন ধরে কেবল সমুদ্র দেখে আমাদের চোখ নতুন কিছু খুঁজছিল। লম্বা লম্বা গাছ আর ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা ধরে গাড়ি চলার সময় মনে হচ্ছিল আফ্রিকার ‘ভীষণ অরণ্য’তে চলে এসেছি! একটা জায়গায় গিয়ে টিকেট কেটে নিতে হল। একদল মানুষ দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা পার্কটার দেখাশুনা করছে; কিন্তু কোথাও কৃত্তিমতার ছোঁয়া নেই! সবকিছু এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, যেকোন সময় যদি আমাদের সামনে একটা বাঘ লাফ দিয়ে চলে আসে তাতেও বোধকরি অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না! চারদিক থেকে বিভিন্ন পাখি আর পোকামাকড়ের ডাক শোনা যাচ্ছে। পার্কটা অনেক বড়, আর অনেক দূর পরপর একটা করে ছোট রেস্ট হাউজ। কেউ চাইলে এগুলো ভাড়া নিয়ে সপ্তাহখানেক কাটিয়ে যেতে পারবে এই জঙ্গলে। জঙ্গলটা ঘুরে দেখার পর আমরা বেশ ক্লান্ত হয়ে যখন গাড়ির ভিতর ঢুকে এসির বাতাস খেতে চাচ্ছি; মামুন ভাই বললেন দেখা এখনো শেষ হয়নি। পার্কের এক স্টাফের সাথে কথা বলে জানলেন, যদি এখান থেকে আরও মিনিট বিশেক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটি, খুব সুন্দর একটা বীচ দেখতে পাব। আবার হাঁটতে হবে শুনে কেউ যেতে চাচ্ছিলো না। মামুন ভাই সবাইকে ফেলেই হাঁটা ধরলেন। লোকটা পারেও- সারাটা রাস্তা একা ড্রাইভ করলেন, ভারী ‘নাইকন ডি নাইনটি’ ক্যামেরা কাঁধে বয়ে নিয়ে পুরো রোড ট্রিপের প্রায় সব ছবি তুললেন, আর সারা রাস্তাব্যাপী তার বিখ্যাত ‘বকরবকর’ তো আছেই। ঝুলিতে উনার অসংখ্য গল্প! পিছে পিছে আমিও হাঁটা ধরলাম। বাকীরাও তখন বাধ্য হয়ে জামাতে শরীক হল। প্রচন্ড গরমের মধ্যে টানা হেঁটে গেলাম, কখনো ঘন জঙ্গল, কখনো মরুভূমির মত তপ্ত সাদা বালি। আবারও বলি, হাতে ঠান্ডা গেটোরেডের বোতল না থাকলে সেদিন বোধহয় পানিশূন্য হয়ে মারাই যেতাম সবাই!

(সেইন্ট যোসেফ পেনিনসুলা স্টেট পার্কের ভেতরের জঙ্গল)

কষ্টকর হন্টন শেষে যা পেলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন! এই বীচটা একদম অন্যরকম। সাদা মসৃণ বালির পাহাড়, সমুদ্রের চক্‌চকে পানি, ভাঙ্গা জাহাজের মত এদিক সেদিক পরে থাকা শুকনো গাছ, হাজার হাজার লাল কাঁকড়া, সারি সারি কাঁশফুল, পরিস্কার নীল আকাশে তুলোর মত ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ, পেছনে অনেক দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ঘন সবুজ জঙ্গল- সব মিলিয়ে অসাধারণ! আমরা ছাড়া আশেপাশে মানুষজনও নেই তেমন, কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। পার্কের অধীনস্থ প্রাইভেট বীচ বলেই এত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে পেরেছে। বুঝলাম সিনেমার শ্যুটিং এর জন্য পরিচালকারা এধরণের জায়গাতেই চলে আসে। পাইরেট্‌স অব দি ক্যারিবিয়ানে ক্যাপ্টেন জ্যাক্‌ স্প্যারো যে একটা দ্বীপে নামে, জায়গাটা অনেকটা তেমনই।

(সেইন্ট যোসেফ পেনিনসুলা স্টেট পার্কসংলগ্ন সমুদ্র সৈকত)

সাগরের পাশেই একটা জায়গা হলুদ কর্ডন দিয়ে ঘেরাও করা দেখে আগ্রহী হয়ে কাছে গেলাম। লেখা আছে একটা কচ্ছপের ডিম পাড়ার সময় হয়েছে, তাই ওখানে বালির একটু নিচেই সে গর্ত করে বাসা করেছে। কর্তৃপক্ষ তাই কচ্ছপটির দেখাশুনার দায়িত্ব নিয়েছে এবং কেউ যেন বিরক্ত না করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে! মনে মনে আরও একবার মুগ্ধ হলাম এদের জীব বৈচিত্রের প্রতি সচেতনতা দেখে। ওখানেই একটা টিলার উপর ওঠার পর বুঝতে পারলাম কেন এটা পেনিনসুলা স্টেট পার্ক। পেনিনসুলা হল ভূখন্ড থেকে সাগরে লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসা স্থলভাগ। এই পেনিনসুলার একপাশে গালফ্ অব মেক্সিকো অন্যপাশে সেইন্ট যোসেফ বে। ঐ টিলার উপর দাঁড়ালেই কেবল এটা দেখা যায়। ফটোসেশন চললো আরও কয়েক দফা। মামুন ভাইয়ের ক্যামেরার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, পুরো রোডট্রিপে প্রায় ছয়শ ছবি তোলা হল।

(ডিম পাড়তে আসা কচ্ছপের জন্য…)

(পেনিনসুলাঃ বামে গালফ্ অব মেক্সিকো আর ডানে সেইন্ট যোসেফ বে)

অন্ধকার হয়ে এলে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। আর ঘোরাঘুরি নয়, বাড়ি পৌঁছুতে হলে আরও সাত ঘন্টা ধরে প্রায় তিনশ মাইল ড্রাইভ করতে হবে। মামুন ভাই স্থির চিত্তে ড্রাইভ করেই চললেন, সাথে চলছে গল্পগুজব। অপু ভাই সুযোগ পেলেই অপি করিমকে টেনে নিয়ে আসছেন, আর মামুন ভাইও পাল্টা অপু ভাইকে মিস্টার এক্সট্রা বলে খেপাতে লাগলেন (ঐ যে হোটেলের পঞ্চম ব্যক্তি…)। ওয়ায়েস ভাই প্রায়ই উদাসীন হয়ে যাচ্ছিলেন, বেশ কয়েকবার দলছুট হয়ে হারিয়েও গেছেন। আবার তাকে খোঁজাখুঁজি করে বের করা হয়। তানভীর ভাই শেষদিকে একটু চুপচাপ রইলেন, বোধহয় কিছুটা ক্লান্ত। রাতের অন্ধকারে বেশ কিছু র‍্যাকূন (ছোট আকারের ভালুক জাতীয় প্রাণী) আমাদের চলন্ত গাড়ির সামনে পরে আত্মাহুতি দিল! দূর থেকে গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে পাশের জঙ্গল থেকে লাফ দিয়ে এসে রাস্তা উপর বসে থাকে। ড্রাইভাররা চাইলেও শেষ মুহূর্তে আর পাশ কাটানো সম্ভব হয়না। বেশ খারাপই লাগলো এগুলোকে আমাদের গাড়ির সামনে এভাবে মরতে দেখে।

(বিভিন্ন বীচে তোলা আরও কিছু ছবি…)

সোমবার ভোর চারটার দিকে আমরা অরল্যান্ডো এসে পৌঁছলাম। ঊইকেন্ড শেষ, তাই সবাই মনে মনে গল্প সাজাচ্ছি আজ ল্যাবে/অফিসে/ভার্সিটিতে বসকে কী বলে ফাঁকি দেয়া যায়। শরীরের উপর দিয়ে যে ধকল গেছে তা কাটতে এক সপ্তাহের ঘুম প্রয়োজন! আটচল্লিশ ঘন্টায় আমরা প্রায় এগারশো মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলেছি! দেখেছি পনরটা সমুদ্র সৈকত!! আমি গাড়িতে বসে আধঘন্টা পরপরই সেলফোন থেকে টুইট করছিলাম কখন কোথায় যাচ্ছি বা কী দেখছি। জানি যে মাসখানেক পরে যখন লিখতে বসব তখন প্রায় কিছুই মনে থাকবে না। আজ লেখার শুরুতেই তাই পুরনো সেই টুইটগুলো আর ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো নিয়ে বসেছিলাম। তারপরেও অনেককিছুই বাদ পড়ে গেছে মনে হচ্ছে। ও হ্যাঁ মজার ব্যাপার হল আমার বন্ধু ম্যাট্‌কে যখন আমাদের এই রোডট্রিপের কথা বললাম সে বললো, ‘আমি বাইশ বছর ফ্লোরিডাতে থেকে যা দেখি নাই, তোমরাতো দুইদিনের তা দেখে ফেললা!!’ মনে মনে বললাম, যাক্‌ আসলেই সফল একটা ট্রিপ দিলাম আমরা। ধন্যবাদ মামুন ভাইকে, সবকিছুর জন্য।

(চলবে)

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

শেষ ব্লগটা লিখেছিলাম প্রায় দুই মাস আগে। মাঝখানে লেখার মত অনেক কিছুই ঘটেছে; কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে লেখা হয়ে ওঠেনি। থিসিস লেখা আর তার ডিফেন্স নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বটে, তবে সেটাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাবো না। সেদিন বুয়েটের এক জুনিয়রের (জয়) সাথে কথা হচ্ছিলো, একসময় সে বললো ভাইয়া আপনি আর ব্লগ লেখেন না কেন? আমি আর আমার বন্ধুরা আপনার ব্লগের জন্য অপেক্ষা করে থাকি। আমি বললাম, বলো কী! আমিতো ধরে-বেঁধে ফেইসবুকের বন্ধুদের আমার ব্লগ পড়াই…যাই হোক, ওর কথা শুনে ঠিক করলাম শীঘ্রই লিখতে হবে। গত দুই দিনব্যাপী রোডট্রিপটা নিয়েই লিখে ফেলি এখন; দেখা যাক ওভেন ফ্রেশ কিছু বের হয় কি না…

ট্যুরের মূল উদ্যোক্তা- মামুন ভাই, পেশায় ডেন্টিস্ট। শখের ফটোগ্রাফারও বটে, তাই ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। বাকি সবাই (তানভীর ভাই, ওয়ায়েস ভাই, অপু ভাই) গ্র্যাড স্টুডেন্ট। পাঁচজনের দল, মূল ড্রাইভারও মামুন ভাই। সাথে ব্যাকআপ ড্রাইভার তানভীর ভাই। রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়ি নিয়ে রেখেছিলাম আগের দিনই। ঠিক করা হল সমুদ্রপাড়ে গিয়ে সারাজীবনই তো সূর্যাস্ত দেখলাম; এইবার সূর্যোদয় দেখব। তাই শনিবার ভোর চারটার সময়ই বেড়িয়ে পড়লাম। রাত জেগে ইন্টারনেটে বসে থাকার কারণে এত সকালে ওঠার অভ্যাস নেই একদম। তাই সবারই ঘুম জড়ানো চোখ। তবে একটা চাপা উত্তেজনাও আছে, এত বড় রোডট্রিপে আমরা আগে কখনো যাই নি। প্ল্যান হচ্ছে সবচেয়ে কাছের বীচে গিয়ে সূর্যোদয় দেখা, তারপর আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে উত্তরে চলতে চলতে যতগুলো বীচ পাওয়া যায় সবগুলোতে নামা। মাঝখানে পড়বে ফ্লোরিডার রাজধানী ট্যালাহাসি, এই ফাঁকে রাজধানীটাও ঘুরে ফেলা যাবে। তবে না, সেখানেই আমরা থেমে যাব না। ফ্লোরিডা স্টেটটা যেমন ধীরে ধীরে পশ্চিমে বেঁকে গিয়েছে, আমরাও দিক পরিবর্তন করে পশ্চিমে চলে যাব, যেন গালফ্ অব মেক্সিকো’র সৈকতগুলোতেও নামতে পারি। এক রোডট্রিপে আটলান্টিক আর গালফ্ অব মেক্সিকো দুটোই দেখা হয়ে যাবে। আর সবশেষে পশ্চিমের প্রায় শেষ প্রান্ত পেনসাকোলা বীচের কাছে কোন এক হোটেলে গিয়ে উঠব, সেটাই হবে আমাদের রোডট্রিপের সর্বশেষ পয়েন্ট। শুনেছি ওখানে বেশ বড় একটা বন্দরও আছে।

এখানে ভোর হয় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। হিসেব করে দেখলাম সূর্যোদয় দেখতে হলে ডেটোনা বীচে নামা উচিৎ আমাদের। আগেও এখানে এসেছি বেশ কয়েকবার জাহাঙ্গীর ভাই আর আমার বন্ধু মামুনের সাথে। বালি বেশ শক্ত হওয়ার কারণে এই সৈকতে গাড়ি বা অন্যান্য মোটরযান দেখা যায় প্রচুর। আর বীচের কাছেই রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত নাস্‌কার এর মোটরস্পোর্টস রেসিং ট্র্যাক। তবে সেদিন এত ভোরে মানুষজন ছিল না বললেই চলে। চারিদিক খুব শান্ত আর আরামদায়ক ঠান্ডা একটা বাতাস। আমি কিছুক্ষণ পাড় বরাবর দৌড়ে নিলাম ঘুম দূর করার জন্য। গ্রুপের কেউ কেউ সাগর পাড়েই ফজর নামাজ পড়ে নিল। এরপর মামুন ভাই ক্যামেরার ট্রাইপড সেট করে ফেললেন বালির উপর- সূর্যোদয় কাভার করা এই ট্রিপের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোথায় যেন পড়েছি সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর সব প্রাণী অস্থির বোধ করে। সূর্যোদয়ের ব্যাপারে কি বিপরীত কিছু বলা আছে যে, যারা ভোর হওয়া দেখবে অদ্ভূত এক প্রশান্তি নিয়ে দিন শুরু করবে? শেষ কবে সূর্যোদয় দেখেছি মনে পড়ছে না, তবে সমুদ্রপাড়ের এই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। যাই হোক, প্রায় ঘন্টাখানেক থেকে সুন্দর সুন্দর কিছু ছবি তুলে আবার আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম।

(ডেটোনা বীচে মামুন ভাইয়ের তোলা সূর্যোদয়ের ছবি)

ফ্লোরিডাকে বলা হয় সানশাইন স্টেট। আমেরিকার উত্তরের বরফপড়া স্টেটগুলোর সাথে তুলনা করে এই নামটা পজিটিভ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই সূর্যের তীব্রতা এত বেশি যে চামড়া একেবারে পুড়ে যায়। দেশে কখনো সানগ্লাস ব্যবহার করতাম না। এখানে প্রথম প্রথম এসে যার সাথেই বের হতাম, দেখতাম চশমা পড়ে ছিল বা অ্যাম্নেই বের হয়েছে, কিন্তু বাইরে গিয়েই সানগ্লাস কোত্থেকে যেন বের করে ফেলেছে! মানে সবাই সাথে রাখে, তা না হলে এই তীব্র আলোতে চোখ ব্যথা করে। এই সূর্য বাংলাদেশের সূর্যের মত না। অতিবেগুণী রশ্মিও অনেক বেশি। ভাগ্যিস দেশ থেকে আমিও একটা পাওয়ারসমেত সানগ্লাস অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনেছি। মুখের চামড়া বাঁচানোর জন্য মাথায় ক্যাপও পড়তে হয়। একারণেই ফ্লোরিডাতে বড় হওয়া সাদা চামড়ার আমেরিকানরাও অতটা সাদা না; কিছুটা তামাটে। আর যারা সমুদ্রপাড়ে বড় হয় তাদের চামড়া একদম রোদেপোড়া লাল। যাক গে, পুরোনো অভ্যাসমত অফটপিকে চলে যাচ্ছি বোধহয়। আটটা বাজতেই যখন বাইরে গরম পড়ে গেল, একটা গ্রোসারীতে (পাবলিক্স) ঢুকে কুলার, বেশ কিছু বরফ, অনেকগুলো গেটোরেডের বোতল, পাউরুটি, কলা, ডোনাট ইত্যাদি কিনে নিলাম। সকালের নাস্তা পাবলিক্সের বাইরে একটা বেঞ্চিতে বসেই সেরে নিলাম।

দ্বিতীয় যে বীচে গাড়ি পার্ক করলাম তার নাম এক ধনকুবেরের নাম অনুযায়ী ফ্ল্যাগলার বীচ। তখনো মানুষজন বেশি নেই, আসতে শুরু করেছে কেবল। এরকম সপ্তাহান্তে আমেরিকানরা পরিবার নিয়ে সারাদিনের জন্য চলে আসে। সারাদিনব্যাপী রোদে চামড়া পোড়ায়, বাচ্চারা বালি দিয়ে খেলতে থাকে, আর সমুদ্রস্নান তো আছেই। দেখলাম কিছু মানুষ লম্বা লাঠির মত মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কী যেন খুঁজছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করার সুযোগ হলো না, অনুমান করে নিলাম বীচে মানুষের হাত থেকে পড়ে যাওয়া আংটি বা এরকম মূল্যবান কোনকিছু বোধহয় খুঁজছে। মনে মনে ভাবলাম, এ তো খড়ের গাঁদায় সূচ খোঁজার মতন ব্যাপার হয়ে গেলো!! এরপর আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে গাড়ি চলতেই লাগল, গাড়ি থেকে দুইপাশের দৃশ্যও বেশ সুন্দর। মেঘ বা পানির গভীরতার কারণে পানিতে বিভিন্ন রঙের শেড পড়ছে। গাড়ির ভিতরে আমাদের হৈ-হল্লা আর গাল-গল্পও চলছে সমানে। মামুন ভাই আমাদের চেয়ে বেশ সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আলাপ আলোচনায় মিশে যান একেবারে বন্ধুর মতই। একই রকম রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা ড্রাইভ করতে হয় বলে ড্রাইভারের সাথে সবসময়ই কথা বলতে হয় কারো না কারো। তা না হলে ড্রাইভারের ঘুমিয়ে পড়া বিচিত্র কিছু না। আমাদের গল্পে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি লাইফের নানা কাহিনী উঠে আসছিল। উঠে আসছিল সফল/ব্যর্থ প্রেমের কাহিনীও। একপর্যায়ে মুখ ফসকে অভিনেত্রী অপি করিমের প্রতি মামুন ভাইয়ের বিশেষ অনুরাগের কথা কী করে যেন বেরিয়ে পড়ল। তখন আর পায় কে, অপু ভাই একেবারে ছাই দিয়ে মাছ ধরার মতো করে মামুন ভাইকে ধরলেন। মামুন ভাই যখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত, বিয়ের উপযুক্ত পাত্র, সেই সময়ের সাথে অপি করিমের বুয়েট থেকে পাশ করার সময়ের কোন একটা যোগসূত্র বের করে ফেলা হল আর এ সংক্রান্ত নানা গল্পে মামুন ভাইকে নিয়ে আমরা মেতে উঠলাম। আর মামুন ভাইও বাঁচার জন্য বারবার বাইরের বিভিন্ন দৃশ্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন…

এরপর একে একে ম্যারিনল্যান্ড বীচ, ক্রিসেন্ট বীচ আর সেন্ট অগাস্টিন বীচ ঘুরে ফেললাম। আর পথে সুন্দর কোন জায়গা দেখলেই গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলে নিচ্ছিলাম। সেন্ট অগাস্টিনের কাছে একটা সাইনবোর্ড দেখে নামলাম যেখানে লেখা ১৫৬৫ সালে ৩০০ জন ফ্রেঞ্চ ফ্লোরিডা দখলের উদ্দেশ্যে ওখান দিয়ে আসছিল। স্প্যানিয়ার্ডরা উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তাদের সবাইকে ছুরি দিয়ে ওখানেই হত্যা করে। এরকম জায়গা দেখলে আর ইতিহাস শুনলে কেমন যেন একটা শিহরণ জাগে।

দুপুর দুইটার দিকে আমরা ঢুকে গেলাম ফ্লোরিডার রাজধানী ট্যালাহাসিতে। বেশ প্রাণবন্ত শহর, রাজধানী বলে হয়তো একটু বেশিই সুউচ্চ ভবন, সুরম্য গীর্জা আর ফুলের বাগান। দেশে থাকতে ভাবতাম পুরো আমেরিকাই বোধহয় নিউইয়র্কের মত। কিন্তু বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটি মূল শহর থেকে দূরে হওয়ায় অবস্থা অনেকটা মফস্বলের মত। সবাই রাত আটটা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে, দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায়। তাই আমরা যারা ঢাকায় থেকে অভ্যস্ত তাদের জন্য এখানকার রাতগুলো একটু ম্যাড়ম্যাড়েই বলা চলে। একারণেই বোধহয় ট্যালাহাসিতে ঢুকে সবার চঞ্চলতা একটু বেড়ে গেল, বুঝলাম সবাই থাকার জন্য এরকম জায়গাই আসলে বেশি পছন্দ করে। একটা রেস্টুরেন্টে (সাবওয়ে) ঢুকে সাব (ব্রেডের মধ্যে মাংস-শাকসবজি-সস ইত্যাদি দিয়ে তৈরি) খেয়ে নিলাম। এই ট্যুর দেয়ার পর মনে হল আমেরিকার রাস্তার পাশে একটু পরপর গড়ে ওঠা গ্যাস স্টেশন, রেস্টরুম, রেস্টুরেন্ট (সাবওয়ে, ম্যাকডোনাল্ডস্‌ চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে) ইত্যাদি যেন তৈরিই করা হয়েছে রোডট্রিপের জন্য।

(চলবে)

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)



দেখতে দেখতে আবার সামার চলে আসলো। সামারে পুরো ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। আন্ডারগ্র্যাডের স্টুডেন্টরা সাধারণত কোর্স নেয় না, ইন্টার্ন করতে এদিক সেদিক চলে যায়। অনেক প্রফেসরও পুরো সময়টাই বাইরে কাটায়। এসময় একপাল ছাত্র-ছাত্রী আসে, আর একজন গাইড তাদেরকে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। ক্যাম্পাস পছন্দ হলেই কেবল এই আমেরিকান স্টুডেন্টরা এখানে আসবে পড়তে! পরে বুঝলাম একারণেই এখানকার ভার্সিটি ক্যাম্পাসগুলো এত সুন্দর করে সাজানো, রীতিমতো ব্যবসা! একটা স্টুডেন্ট চিন্তা করে- গাঁটের পয়সা খরচ করে পড়তে আসব যা যা পারি সুবিধা নিয়ে নেই। তাই আসার আগে দেখে নেয় জিম-সুইমিং পুল কেমন, ক্যাফেটেরিয়ায় নামিদামি রেস্টুরেন্ট আছে কি না, লাইব্রেরি বা কম্পিউটার ল্যাব কতটা সমৃদ্ধ ইত্যাদি।

আমরা বিদেশী স্টুডেন্টরা প্রায় বিনা বেতনে পড়ি আর তার উপর ফান্ডিং পাই শুনলে আমেরিকানরা অবাক হয়ে যায়। এটা ওদের কাছে স্বপ্নের মত ব্যপার! ওদের মধ্যেও যে কেউ কেউ এরকম প্রফেসরদের সাথে রিসার্চ করে ফান্ডিং পায়না তা নয়; তবে আমার ভার্সিটিকে উদাহরণ হিসেবে নিলে, নব্বই ভাগই বিদেশী স্টুডেন্ট যারা ফান্ডিং পায়। আসলে প্রফেসররা আমাদেরকে স্বল্প বেতনে যতটা খাটিয়ে নিতে পারে আমেরিকানদেরকে ওটা কখনোই পারবে না। ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা বাজলেই তারা অফিস থেকে দৌড় দেয়। উইকেন্ডে কাজ করা তো দূরের কথা প্রফেসর কোন ইমেইল করলেই গজগজ করতে দেখেছি ওদের…

আমরা বিদেশী স্টুডেন্টরা চাইলেই এদিক সেদিক কাজ করে পয়সা রোজগার করতে পারি না। কেবল মাত্র রিসার্চ বা অ্যাকাডেমিক কোন কাজের শর্তেই আমাদেরকে আমেরিকায় ঢুকতে দেয়া হয়। তবে এদেশীয় স্টুডেন্টদের প্রত্যেকেই মোটামুটি কোথাও না কোথাও কাজ করে। টিউশন ফী দেয় লোন নিয়ে, শর্ত হলো পাস করার পর কোনভাবে শোধ করে দিবে। আমার এক বন্ধু আছে যার আয়ের উৎস শুনে বেশ আহত হয়েছিলাম। সে লোন নিয়ে টিউশন ফী দেয়, একটা রেস্টুরেন্টে পার্টটাইম কাজ করে, আমার প্রফেসরের সাথে সামান্য বেতনে রিসার্চের কাজ করে আর প্রতি দুইমাসে একবার নিজের রক্ত বিক্রি করে এবং এতে দুইশ ডলার করে পায়! শেষোক্ত উৎসটা আমি একেবারেই আশা করিনি!

সামার নিয়ে লিখতে বসেছিলাম, কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে বিষয়গুলো উঠে আসছে আমার লেখায়। দেখি রগরগে কিছু জিনিস নিয়ে লেখা যায় কীনাঃ গত সামারে এই সময়ে মায়ামী ছিলাম। ঝটিকা সফর বলা যেতে পারে, একরাত ছিলাম মাত্র। অরল্যান্ডো থেকে ছয়জন মিলে নারীবর্জিত (মায়ামী যাওয়ার পূর্বশর্ত) একটা দল গঠন করলাম। রেন্ট-এ-কার থেকে বেশ বড় একটা ভ্যান ভাড়া করলাম। ড্রাইভার কেবল আরেফীন ভাই; আমরা আর কেউ ড্রাইভিং পারিনা। সবাই বাসা থেকে খাবার দাবার নিয়ে নিলো, উদ্দেশ্য খরচ যতটা সম্ভব কমানো। দরিদ্র গ্র্যাড-স্টুডেন্ট বলে কথা…

প্রায় পাঁচঘন্টা পর মায়ামী ডাউনটাউনে প্রবেশ করলাম। কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না- রাস্তাঘাট, বিল্ডিং, মানুষের ভিড় ইত্যাদি দেখে যে কেউ বলবে এটা আমাদের ঢাকা শহর! আলমগীর ভাইয়ের পিচ্চি মেয়ে অরিনও নাকি এখানে এসে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছিলো- ‘আম্মু আমাকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসছো কেন?’ সস্তা টাইপ একটা হোটেলে উঠলাম আমরা, তবে বীচের একেবারে কাছে। জিনিসপত্র রেখেই দৌড়ে চলে গেলাম সাউথ বীচে। ছবিতে পানির রঙ দেখে সবসময় ভাবতাম ফটোশপে বুঝি এডিট করা। কিন্তু মায়ামী বীচের পানির রঙ আসলেই সবুজ! আর পানিতে নামার পর বুঝলাম কেন সবাই এখানে সারাদিন পরে থাকতে চায়- পানির তাপমাত্রা খুবই আরামদায়ক। যখন সৈকতে খুব গরম তখন পানি বেশ ঠান্ডা, আবার সকালবেলা এই পানিটাই হয়ে থাকে কুসুম গরম। 

প্রচুর ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্ট। সৈকতে সুন্দরীরা সানবাথে ব্যস্ত। আচ্ছা সানবাথের বাংলা কি? সূর্যস্নান? ঠিকাছে করুক সানবাথ, চামড়া কাগজের মত সাদা; পোড়ানো দরকার। আমাদের মধ্যে আরেফীন ভাইয়ের এটা দ্বিতীয় মায়ামী ভ্রমণ। তাই তার চোখ সয়ে গেছে; কিন্তু আমরা অত্যুৎসাহী ব্যাচেলর যুবকরা তখনো ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছি কিংবা একে অপরের ছবি তোলার ভান করছি। পাশেই সাগরের ঠান্ডা পানি থাকা সত্ত্বেও তাই প্রচন্ড গরমের মধ্যে সৈকত ধরেই হাঁটতে লাগলাম। এই হন্টন বৃথা যায়নি…

রাতে হোটেলে ফিরে সবাই শাওয়ার সেরে নিলাম। কোথাও খাওয়া দরকার। রান্না করে আনা মাংস আর চিংড়ী আছে, তবে ভাত দুপুরেই শেষ। বাইরে একটা ভারতীয় দোকান থেকে নানরুটি কিনে এনে কাজ চালানো হল। রাত একটার দিকে আবার বের হয়ে পড়লাম রাতের মায়ামী দেখব বলে। ফরহাদ ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ায় হোটেল থেকে আর বের হলেন না। চারিদিকে বেশ আলোকসজ্জা, অনেক মানুষ রাস্তায়, দামি সব গাড়ী পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। একদিকে একটা জটলা মত দেখে আমি এগিয়ে গেলাম। বিশালদেহী এক লোককে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সাথে সাথেই চিনে ফেললাম- কিংবদন্তী রেসলার হাল্ক হোগান! যারা রেসলিং দেখেন না তারা টিভি সিরিজ ‘থান্ডার ইন প্যারাডাইজ’ সূত্রেও তাকে চিনে থাকতে পারেন। রেসলিং এর কড়া ফ্যান হিসেবে মায়ামী আসাটাকে সার্থক মনে হল। সাথে সাথে তার একটা ছবি তুললাম। অন্যদের ডেকে আনতে গেলাম যেন আমার সাথে একটা ছবি তুলে দেয়; কিন্তু ততক্ষণে সে একটা রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে পরেছে।

স্থানীয়দের বেশিরভাগই হিস্প্যানিক অথবা কালো। সাদা চামড়ার মানুষ তেমন একটা দেখিনি ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্ট ছাড়া। চারিদিকে অনেক বার আর নাইটক্লাব। কয়েকটাতে বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখলাম- আধো আলো আর আধো অন্ধকারে নাচ-গান-অ্যালকোহল চলছে পুরোদমে। রাস্তায় মানুষজনের চাহনি পালটে গেছে এই কয়েকঘন্টার ব্যবধানেই। কড়া পারফিউম আর বেশ উগ্র সাজে মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে। আর আশেপাশের লোকগুলো লোভী দৃষ্টিতে তাদেরকে দেখছে। সবাই মোটামুটি মাতাল। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় অসাবধানতাবশতঃ একটা মেয়ের গায়ে হাত লাগলো আমার। তাড়াতাড়ি স্যরি বলে উঠলাম। মেয়েটা বেশ প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। এই হাসি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, নাথিং টু বি স্যরি হিয়ার ইন মায়ামী…পরে রাকিব ভাইরা এটা নিয়ে বেশ মজা করতেন…

রাত তিনটার দিকে আমরা আবার সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসে রইলাম। খুব সুন্দর বাতাস আর আকাশে চাঁদ ছিল। আমরা বালুকায় বসে গল্প করতে লাগলাম। ঠিক পেছনেই একঝাঁক নারীর কোলাহল শুনতে পাই। আমাদের দেখেই কি না জানি না তাদের কথাবার্তা আরও বেড়ে গেল। সবাই মাতাল বোঝাই যাচ্ছিল। আধঘন্টা বসার পর উঠে যেতে বাধ্য হলাম তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে, কোথায় একটু নিরিবিলিতে প্রকৃতি দর্শন করব!! কিন্তু আমাদেরকে উঠে যেতে দেখে তাদের একজন সাহস করে আমাদের কাছে চলেই আসল। বিশালাকৃতির এক নিগ্রো মেয়ে, আবছা আলোতে দেখলাম তার সঙ্গীরাও নিগ্রো। এসে বলে যে, আমরা চাইলেই খুব কম খরচে তার বান্ধবীদেরকে পেতে পারি। একথা শুনে ওয়ায়েস ভাই প্রথমেই এক দৌড়ে দূরে চলে গেলেন। অন্যরা সবাই বেশ থতমত খেয়ে গেছি। একারণেই এতক্ষণ আমাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওরা কথা বলছিল। মেয়েটা ভাবলো আমরা কেউ ইংরেজি বুঝিনা। আমরাও ইংরেজি বুঝিনা এরকম ভান করে আর নো থ্যাঙ্কস টাইপের একটা ভঙ্গি করে মোটামুটি পালিয়ে বাঁচলাম সে যাত্রায়…

পরদিন সাগর আর সৈকতে আরও কয়েকঘন্টা কাটালাম। মাঈনুল ভাইকে শতচেষ্টায়ও পানিতে নামানো গেলনা। সাঁতার জানেন না বলে সৈকতেই ঘোরাঘুরি (!) করে সময় পার করলেন। ফিরতি পথে একটা দাওয়াত পেয়ে গেলাম। ওয়ায়েস ভাইয়ের এক বন্ধুর বড়ভাই থাকেন ওয়েস্ট পাম বীচে। গিয়ে দেখি আমাদের জন্য দুপুরে বিশাল খাবার দাবারের আয়োজন করে রেখেছেন উনি। মুশফিক ভাই বুয়েটের। তাই আমাদেরকে পেয়ে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে লাগলেন। খাওয়া দাওয়ার পর আমাদেরকে আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখালেন। অনেক বাঙালি থাকে ওখানে। ওয়েস্ট পাম বীচেও কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলাম। এই বীচটা একটু অন্যরকম, প্রাইভেট টাইপের। চারিদিকে ঘের দেওয়া, পরিবার নিয়ে সারাদিন কাটানোর জন্য বেশ ভাল জায়গা। বিকেলে মুশফিক ভাই আবার আমাদেরকে স্থানীয় একটা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে লাচ্ছি-মিষ্টি এগুলো খাওয়ালেন। আমাদের কাউকেই উনি চেনেন না। তারপরেও আমাদেরকে পেয়ে যে উনি মন থেকেই খুশি হয়েছিলেন তা বেশ বোঝা যাচ্ছিলো।

বেঁচে থাকলে হয়তো আবার মায়ামী যাওয়া হবে। তবে প্রথমবারের এই অভিজ্ঞতা অনেকদিন মনে থাকবে সন্দেহ নেই… 

(চলবে)

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)


শাকিরা কনসার্টের পর তক্কে তক্কে রইলাম যদি আর কোনো আর্টিস্ট ফ্লোরিডাতে আসে…দুইমাস পরই লিঙ্কিন পার্ক ঘোষণা করল তারা ট্যুরে বের হচ্ছে। ফ্লোরিডাতে দুইটা কনসার্ট করবেঃ একটা মায়ামীর কাছে, আরেকটা টাম্পাতে। টাম্পা আমার কাছাকাছি হলেও দুই ঘন্টার ড্রাইভ। আর এখানে দুই ঘন্টা ড্রাইভ মানে প্রায় একশ মাইল! আশেপাশে বন্ধুদের বললাম; কিন্তু কেউ আগ্রহী না। ঠিক করলাম বাসে যাব, তবে সেক্ষেত্রে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দুই বাসে যাওয়া গেলেও কনসার্ট শেষে এত রাতে ফিরতি বাস থাকবে না। ছয়ঘন্টা বাস স্টেশনে বসে ভোরে অরল্যান্ডো আসাটাও কষ্টকর। বলে রাখি, এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশান সিস্টেম জঘন্য। নিজের গাড়ি না থাকলে তাই কার্যত গৃহবন্দিই থাকতে হয়!

যা হয় হবে ভেবে একাই টিকেট কেটে ফেললাম অনলাইনে। তার আগে অবশ্য তুরেন ভাই আর রেজাকে পটানোর চেষ্টা করলাম। আসলে একা একা যেতে কেমন যেন লাগছিল। তুরেন ভাই অফিসের কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত। আর রেজা লিঙ্কিন পার্কের ভয়াবহ ফ্যান হওয়া সত্ত্বেও আসতে রাজি হলনা দূরত্বের কারণে। ও থাকে টাম্পা থেকে আরও দূরে বোকা রেটনে, প্রায় চার ঘন্টার ড্রাইভ। এতগুলো ডলার খরচ করে টিকেট করলাম, কিন্তু আমি নিজেও নিশ্চিত না একমাস পর ঐদিন আমি ফ্রি থাকব কীনা। এখানে গ্র্যাডলাইফ খুব কঠিন, বিশেষ করে কেউ যখন প্রফেসরের সাথে রিসার্চ করে। কখন প্রফেসর কী চেয়ে বসবে কেউ জানে না। হঠাৎ করেই ঘাড়ের উপর একগাদা কাজ চলে আসে, আর তার সাথে ডেডলাইন তো আছেই…

চিন্তা করলাম যেভাবেই হোক রাইড ম্যানেজ করতে হবে। অরল্যান্ডোতে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে যে কীনা লিঙ্কিন পার্কের কনসার্টে যাচ্ছে। ফেইসবুকে মানুষের স্ট্যাটাস সার্চ দিতে লাগলাম। প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে পাই যে টাম্পার ওই কনসার্টে যাবে বলে আনন্দ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। এভাবে ফেইসবুক, টুইটারে অপরিচিত কিছু মানুষ পেলাম যারা অরল্যান্ডো থেকে ঐ কনসার্টে যাবে। মেসেজ পাঠিয়ে উত্তরও পেলাম। আমার অফার ছিল এরকম যে আমাকে রাইড দিলে আমি গাড়ির ফুয়েল খরচ বহন করব। তবে কেউ কনফার্ম করতে পারছিল না। বেশিরভাগই দলবল নিয়ে যাচ্ছে, গাড়িতে জায়গা নেই। কেউ কেউ আবার আমার বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। হঠাৎ তখন মাথায় আসল রাব্বী ভাই টাম্পায় থাকে। এটা একটা মজার ব্যাপার- আমেরিকার যেখানেই তাকাই বুয়েটিয়ান পেয়ে যাই! রাব্বী ভাই আমার ফোন পেয়ে খুব খুশি হয়ে বললেন, কনসার্ট শেষে সোজা তার বাসায় গিয়ে উঠতে।

হঠাৎ একদিন শুনি আমার কলিগ ম্যাট্‌ তার গার্লফ্রেন্ড ম্যারি আর নিজের জন্য টিকেট কেটেছে। ম্যারি নাকি লিঙ্কিন পার্কের ভীষণ ফ্যান। তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে আগে একটা ভার্সিটির ফুটবল ম্যাচে, স্টেডিয়ামে বসে ওদের সাথে খেলা দেখেছিলাম। তাদের ব্যাপারে মজার কিছু তথ্য দিয়ে রাখি এখানে। প্রতিমাসেই তারা ফেইসবুকে একবার করে ‘সিঙ্গেল’ হয় আর একবার করে ‘ইন এ রিলেশানশিপ’ এ যায়। মাঝে মাঝে রেগেমেগে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকেও বাদ দিয়ে দেয় নিজেদের। আবার কয়দিন পর জোড়া লাগে। ম্যাটের সাথে আমার বেশ ভাল খাতির, তার কারণ সেও আমার মত ফুটবল (সকার) ভক্ত! আমেরিকানদের মধ্যে ফুটবল পছন্দ করে এমন খুব কমই পাই। একদিন সে এসে বলে, ‘তুমিতো জান আমি কনসার্টের দুইটা টিকেট কিনছি। কিন্তু আমাদের ব্রেক-আপ হয়ে গেছে। এখন ম্যারিকে টিকেটগুলা কি গিফ্‌ট দিয়ে দিব, নাকি ওর কাছে সেল করব, নাকি তোমার কাছে সেল করে দিব বুঝতেছি না।’ তখনো আমি টিকেট কাটিনি, আর ম্যাট্‌ জানে যে আমি পেলে কিনে ফেলব। মনে মনে বলি, ‘আমারে দে ব্যাটা, ম্যারিকে নিয়ে আমি যাই’ (একটা তথ্য এখানে দেয়া জরুরী, ম্যারির মত এত সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে কখনো দেখি নাই! খুব হাসিখুশি, বেশ লম্বা, চোখ-চুল-হাসি সবই তার নিখুঁত সুন্দর! তাকে দেখলে যেকোন ছেলেরই বুকে ব্যথামতন লাগার কথা…)। হেসে বললাম, ‘তার জন্য নিয়ত করে কিনছ, তাকে উপহারই দিয়ে দাও…ব্রেক-আপ হইছে তো কী হইছে…’

পরে প্ল্যান চেঞ্জ হল। কারণ তারা আবার ‘ইন এ রিলেশানশিপ’। ম্যাট্‌ জানাল সে ড্রাইভ করে যাবে। আমি বললাম আমি বাসে যাচ্ছি, অথবা কারো রাইড পেলে ফুয়েল খরচ দিতে রাজি আছি। আমি বারবার খরচের কথাটা আনছি তার কারণ আমেরিকানরা টাকা-পয়সার ব্যাপারে খুব খোলামেলা আলোচনা করতে পছন্দ করে। ম্যাট্‌ যে এক পর্যায়ে ম্যারির কাছে টিকেট বিক্রি করতে চেয়েছিল সেটাই তার প্রমাণ। অর্থসংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের কোন রাখঢাক নেই। ম্যাট্‌ জানালো, আমি চাইলে তাদের সাথে যেতে পারি। আমি হেসে বললাম, তোমরা দু’জন একসাথে যাচ্ছ…আমি তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে রোমান্টিক ট্রিপটা নষ্ট করতে চাই না। পরের দিন ম্যারি আমাকে মেসেজ পাঠালো যে আমি গেলে তারা খুবই খুশি হবে এবং না গেলেই বরং মাইন্ড করবে। এইবার আমি বেশ স্বস্তি বোধ করলাম। ঠিক হল তাদের সাথেই যাব। রাব্বী ভাইকে বলে দিলাম যে আমি আর রাতে টাম্পাতে থাকছি না, কনসার্ট শেষেই ফিরে আসব। এরপর থেকে আমি দোয়া করতে থাকি যেন কনসার্টের দিন পর্যন্ত তারা ‘ইন এ রিলেশানশিপ’ এ থাকে। নতুবা আমার যাওয়া আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে…

সৌভাগ্যক্রমে কনসার্টের দিন তেমন কোন কাজ পড়েনি। ম্যাট্‌ আমাকে বাসা থেকে তুলে নিল, তারপর গেলাম ম্যারির বাসায়। ও তখনো রেডী হচ্ছে। আমরা ড্রয়িং রুমে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যে তথ্যটা শুনে টাশ্‌কি খেলাম তা হল ম্যারির সাথে রুম শেয়ার করে একটা ছেলে। কিন্তু ও ‘গে’, তাই তার সাথে শেয়ার করতে নীতিগতভাবে কোন সমস্যা নেই। অন্তত ম্যাটের নেই! আমাদের দেশে এক ধর্মের একটা মেয়ে যেমন অন্য ধর্মের একটা ছেলের সাথে সাবলীলভাবে চলাফেরা করে, এই ব্যাপারটাকে তারই ভিন্ন রূপ বলে মনে হল…

আমার নিউইয়র্কে থাকা বন্ধু রিফাত বলেছিল স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটতে আর একটু আগে আগে যেতে। তাতে নাকি আমি স্টেজের কাছাকাছি থাকব। তার কথা শুনেই স্ট্যান্ডিং টিকেট কেটেছি। ম্যারি আর ম্যাট্‌ অবশ্য গ্যালারিতে। একঘন্টা আগেই পৌঁছে গেলাম। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি মানুষজন তেমন নেই! তখন সবাই মাত্র আসতে শুরু করেছে। ম্যারি সাবধান করে দিল যে স্টেজের কাছে অনেক ক্রেজী দর্শক থাকে। আমি নিরাপদ দূরত্বে থাকব কথা দিয়ে একদৌঁড়ে চলে গেলাম স্টেজের একেবারে সামনে। আমার সামনে মাত্র তিনটা লাইন, মানে তিনটা মাথা! বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এত কাছ থেকে লিঙ্কিন পার্কের পারফরম্যান্স দেখব, তাও আবার ইনডোরে! একসময় এই ব্যান্ডের প্রায় সবগুলো গানের লাইভ পারফরম্যান্সের ভিডিওতে কম্পিউটার ভর্তি ছিল…যারা আমার কম্পিউটার দেখেছে তারা নিশ্চয়ই জানে যে মূল গানের চেয়ে লাইভটার ভিডিওই বেশি ছিল আমার সংগ্রহশালায়।

প্রথমে ছোটখাট দু’টো ব্যান্ড গান গাইলো। রাত সাড়ে আটটার দিকে অনেক আয়োজন করে মঞ্চে প্রবেশ করল প্রথমে মিঃ হানলোকটা অনেক মোটা হয়ে গেছে। তারপর অন্য সদস্যরা, সবার শেষে মাইক শিনোডা আর চেস্টার বেনিংটন- দুই জনপ্রিয় ভোকাল। একসময় হয়ত দলের মূল ভোকাল ছিল চেস্টারই। তবে মাঝখানে দুইজনই পৃথক পৃথক হয়ে কাজ করায় এখন মাইক শিনোডার ভক্তকূলও বিশাল। তাই দু’জন একসাথে এখনো গান গায়- এটা একটা বিশাল ব্যাপার! আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম চারিদিকে সব ডাই হার্ড ফ্যানগুলা। প্রতিটি গানের প্রতিটি র‍্যাপই তাদের মুখস্থ আর সমানে গেয়ে যাচ্ছিল। তবে এই জাতি বেশ ভদ্র জাতি। আমার পেছনে যারা ছিল, আমাকে টপকে সামনে যাওয়ার প্রবণতা কারো মাঝেই দেখিনি। শাকিরা কনসার্টে সব দর্শক ছিল হিস্‌প্যানিক। কিন্তু এখানে মোটামুটি সবাই সাদা চামড়ার আমেরিকান। কিছু এশিয়ানও দেখেছি। হঠাৎ আমার পেছন থেকে এক ছেলে হাসিমুখে এসে আমাকে আর আমার পাশেরজনকে চুইংগাম দেয়া শুরু করল- আরে খাও। আমরা আমরাই তো, সবাই আমরা লিঙ্কিন পার্কের ফ্যান। চুইংগাম নেয়ার পরে বলে, ‘এখন কি আমি তোমাদের সামনে যেতে পারি? আমি একটু বেশি কড়া ফ্যান, তাই একেবারে সামনে গিয়ে হেড ব্যাং না করলে পোষাচ্ছে না।’ তার অমায়িক ব্যবহার আর কৌশলে মুগ্ধ হয়ে আমরা তাকে হাসতে হাসতে বললাম, ঠিক আছে যাও যাও…

একে একে প্রায় আঠারোটা গান গাইল তারা। র‍্যাপ আর রকের এত চমৎকার কম্বিনেশান আর কেউ করতে পারে না। চেস্টার তার পাতলা শরীর নিয়ে স্টেজের এপাশ থেকে ওপাশে বিশাল বিশাল জাম্প দিয়ে যাচ্ছিল। মাইক বলে, চেস্টার নাকি নিজের বাসায় সারাদিনই এই জাম্প দেয়া প্র্যাকটিস করে আর এভাবে অনেকবারই হাত ভেঙ্গেছে! আমি আগের পর্বে বলেছি যে এরা কনসার্টে গানের কোয়ালিটি বা সুর পরিবর্তন করে না। এবারও তার প্রমাণ পেলাম। মনে হচ্ছিল মূল গানটাই প্লে করছে। আমি অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে একটা কনসার্টে চেস্টার যে পরিমাণ পরিশ্রম করছে, এভাবে পুরো নর্থ আমেরিকা ট্যুর কিভাবে দিবে! পরে খবর পেয়েছি কয়েকটা স্টেট কভার করার পর আসলেই চেস্টার অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং অবশিষ্ট ট্যুরগুলো বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে…

কনসার্ট শেষে বাইরে এসে যখন ওদের সাথে দেখা করলাম, ওরা বারবার বলছিল রিজ (এখানে আমেরিকানরা আমাকে এই নামেই ডাকে), তুমি কত কাছে ছিলা। আমরা জানলে আমরাও স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটতাম। বিশেষ করে ম্যারি, মাইক শিনোডা বলতে সে অজ্ঞান। আমাকে জিজ্ঞেস করল একেবারে শেষে মাইক যখন পানি ছিটাচ্ছিল আমার উপর পড়েছে কীনা। আমি আমার জ্যাকেটের কাঁধে দেখালাম, এই যে পানির ফোঁটা। পাগল মেয়েটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল- যেন মাইক শিনোডার কাছ থেকে কিছু একটা তার কাছে বয়ে এসেছে…

বিঃদ্রঃ আগ্রহী পাঠকগণ চাইলে ছবি বা ভিডিও দেখতে পারেন।

(চলবে)

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)


লাইভ কনসার্টের প্রতি আকর্ষণ সবসময়ই ছিল; তবে ঢাকায় আসার আগে সে সুযোগ কখনো হয়নি। বুয়েটের কল্যানে প্রথম দু’বছরেই এলআরবি, মাইলস্‌, ওয়ারফেজ, আর্টসেল, শিরোনামহীনসহ আরও কিছু ছোটখাট ব্যান্ডের কনসার্ট দেখা হয়ে যায়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে সারাদেশে কনসার্ট বন্ধ করে দিলে বুয়েটেও খরা চলতে থাকে।

পহেলা বৈশাখে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান কখনো মিস করতাম না। তারা দেশের বিখ্যাত কিছু বাউল নিয়ে আসত ঐ রাতে। সারাজীবনই টিভিতে বাউল গান দেখলে চ্যানেল পালটে দিয়েছি। কখনো ভাবিনি সরাসরি দেখতে এত ভাল লাগবে! আর ঐ অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে গান গাইত শিরোনামহীন। নিজের ডিপার্টমেন্ট বলে ব্যান্ডের ভোকাল প্রিয় তুহীন ভাইকে আমরা পেতাম আরও আপন করে। জেমস্‌কে বুয়েটে না পেলেও কনসার্ট মিস হয়নি। একবার সানরাইজ থেকে কোচিং করে মিরপুরে বাসায় যাওয়ার পথে দেখি রাস্তায় অনেক ভীড়। শুনি জেমস্‌ আসবে! ওটাই ছিল ঢাকায় প্রথম কনসার্ট, তাও আবার প্রিয় গায়ক জেমস্‌! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এত এত ব্যান্ডের কনসার্ট দেখার পরও আমি বলব জেমস্‌ই সেরা। তার মত কনসার্ট আর কেউ মাতাতে পারে না। আর একবার জেমস্‌কে পেলাম আদনান সামীর কনসার্টে। কাজিন সাত্তার ভাইকে এই ফাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি- ঐ আমলে পাঁচশ টাকা করে টিকেট কেটে আমাকে আর শান্তকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আদনান সামী তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। একটা পর একটা ভাল গান উপহার দিয়েই যাচ্ছে। তো তার আসার আগে জেমস্‌ গাইল সাত/আটটা গান এবং যথারীতি মাতিয়ে দিয়ে গেল। এরপর আদনান সামী হাজার রকমের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির। সেগুলো প্রায় দুই ঘন্টা ধরে টিউন করা হল। অনেকগুলো গান গাইল সেদিন, স্থূল শরীর নিয়ে কিছুক্ষণ নাচারও চেষ্টা করল। তবে লোকটা জিনিয়াস, কীবোর্ডে যে এশিয়ার দ্রুততম তা প্রমাণ করে ছাড়ল! আরেকটা পার্থক্য টের পেলাম তখনই যে এরা লাইভ কনসার্টেও মূল মিউজিকটা দেয়ার শতভাগ চেষ্টা করে যেটা কীনা দেশের ব্যান্ডগুলোর মাঝে পাইনি।

ফ্লোরিডাতে আসার কয়েকমাস পরেই শুনি শাকিরা নর্থ আমেরিকা ট্যুরে বের হচ্ছে। বিশ্বকাপে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গেয়ে তখন সে ব্যাপক ফর্মে। চারিদিক থেকে আওয়াজ আসছেঃ ‘একদিকে শাকিরা, অন্যদিকে বাকিরা’। আমেরিকায় কেউ নতুন অ্যালবাম বের করলে সাধারণত সেটার প্রচারণার জন্য ট্যুরে বের হয়। প্রায়ই তা শুরু হয় সর্বদক্ষিণের স্টেট ফ্লোরিডা দিয়ে। আর ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে মায়ামী বা অরল্যান্ডোর জনপ্রিয়তা তো আছেই। তো অরল্যান্ডোতে বাড়ির এত কাছে এসে শাকিরা গেয়ে যাবে আর আমি যাবনা তা কী করে হয়! মাইনুল ভাই আর আমি একসাথে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। দুইজন মিলে টিকেট কেটে রাখলাম তিনমাস আগেই! পরের দিকে ঐ টিকেটের দাম বেড়ে গিয়েছিল অন্তত পাঁচগুণ! যাই হোক, কনসার্টের দুইদিন আগে মাইনুল ভাই মন খারাপ করে জানালেন যে উনি যেতে পারছেন না। ল্যাবের কোন কাজ পরে গিয়েছিল বোধহয়। তবে উনি টিকেট দিয়ে দিলেন আমাকে যেন আমার একা যেতে না হয়। বলে কয়ে রাজী করলাম আরেফীন ভাইকে। শাকিরার ফ্যান না হওয়ায় প্রথমে উনি যেতে চাচ্ছিলেন না! আমি যুক্তি দেখালাম, ‘ভাই তার গান না শুনলেন; তারে চাক্ষুস দেখতে তো যাইতে পারেন’। এবার আরেফীন ভাই তার নাইকন ক্যামেরা নিয়ে বের হলেন আমার সাথে।

গিয়ে দেখি চারিদিকে সব হিস্প্যানিক মানুষজন। আমাদের বাদামী চামড়া দেখে অনেকেই ভাবছে আমরাও হিস্প্যানিক! চমকে উঠলাম যখন গেটে টিকেট চেকারও আমাদের সাথে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে উঠল! কনসার্ট ছিল ইনডোরে। ভেতরে একজনও সাদা চামড়ার আমেরিকান নেই! পরে বুঝলাম, শাকিরা আন্তর্জাতিকভাবে অনেক জনপ্রিয় হলেও; আমেরিকায় প্রধানত হিস্প্যানিকরাই তার গানের শ্রোতা। সত্যি বলতে কী ওখানে আমাদেরকে বহিরাগত মনে হচ্ছিল, আর শাকিরাকে মনে হচ্ছিল তাদের নিজেদের কেউ! মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, যেহেতু তার বেশিরভাগ গানেরই ইংরেজী-স্প্যানিশ দুইটা ভার্সনই থাকে; তাই আজ তার ইংরেজীতে গান গাওয়া তো দূরের কথা, কথা বলারও কোন সম্ভাবনা নেই। সন্দেহ আংশিক সত্য হল- কিছু গান স্প্যানিশেই গাইল। তবে বিখ্যাত গানগুলো ইংরেজীতে। আমাদেরকে ধন্য করে দিয়ে কথাও বলছিল বেশিরভাগই ইংরেজীতে। আমরাও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম- এইটা আমেরিকা; তার দেশ কলম্বিয়া তো আর না…

সময় নষ্ট না করে শাকিরা খুব দ্রুত একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছিল। তাড়াহুড়ার কারণ সহজেই অনুমেয়- দুইমাস ধরে প্রতি দুইদিনে একটা করে কনসার্ট করতে হলে প্রফেশনাল হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে গান-মিউজিক-নাচ কোনকিছুর মানই একবিন্দু কমে যায়নি। প্রতিটা গানের সময়ই শাকিরা নাচছিল মূল মিউজিক ভিডিওর অনুকরণে। এমনকি জামাও পালটে যাচ্ছিল সে অনুযায়ী। সেদিন আমরা বসেছিলাম স্টেজ থেকে অনেক দূরে। গান শোনার ঝামেলা (!) না থাকায় আরেফীন ভাই মনের সুখে তার শক্তিশালী ক্যামেরা দিয়ে জুম করে ছবি তুলে যাচ্ছিলেন। আগ্রহী পাঠকগণ চাইলে ছবি বা ভিডিও দেখতে পারেন।

(চলবে)

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

ভয়াবহ ব্যাপার! আজকে থেকে আমাদের প্রফেসরের বউও অফিসে বসবে! যেকোন গ্র্যাড স্টুডেন্টের জন্যই এটা একটা দুঃস্বপ্ন হওয়ার কথা!

যারা গ্র্যাড লাইফের সাথে পরিচিত না তাদের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখি- এখানে ফান্ডিং পেয়ে যারা পড়তে আসে তাদেরকে সাধারণত প্রফেসরের সাথে রিসার্চ করতে হয়। এজন্য দেয়া হয় নির্দিষ্ট অফিস। একই প্রফেসরের ছাত্ররা সাধারণত একই রুমে বসে। তবে প্রফেসর অবশ্যই ঐ রুমে বসে না। কোন কোন প্রফেসরের যুক্তি- ছাত্ররা যেহেতু রিসার্চের জন্য ঘন্টাপ্রতি বেতন পাচ্ছে, তাই চাকরীর মতই সকাল-সন্ধ্যা অফিস করতে হবে। অফিস থেকে বের হতে পারবে কেবল কোন ক্লাস থাকলে।

এমনিতে আমাদের প্রফেসর কাজ পেলেই খুশি, অফিসে বসেই সেটা করতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সমস্যা হল চায়নিজ কলিগদেরকে নিয়ে। আমার প্রফেসর যেহেতু চায়নিজ, তাই গ্রুপেও চায়নিজদের আধিক্য। আর তারা সারাক্ষণই অফিসে বসে থাকে। আসলেই সারাদিন ধরে কাজ করে, নাকি ‘ইজি কাজে বিজি’ তা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।

সেমিস্টারের প্রথম দিন বলে আমি সকাল থেকেই অফিসে ছিলাম। এই সময় প্রফেসর তার বউকে নিয়ে হাজির। জানালেন এই সেমিস্টারে একটা প্রজেক্টে সে কাজ করবে। শুনে আমরা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার ভান করলাম। চেয়ার, টেবিল আর একটা কম্পিউটার তাকে সেট করে দেয়া হল। তারপর যে যার কাজে মনোনিবেশ করলাম। কারও ব্রাউজারেই ফেইসবুক/টুইটার-এর চিহ্নও নেই। সবাই কেবল গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটগুলোতেই ব্রাউজ করছে। কে জানে, কোন ফাঁকে ঐ মহিলা দেখে ফেলে আর বাসায় গিয়ে বলে বসে- ওগো, জানো…তোমার ঐ স্টুডেন্টটা না মস্ত ফাঁকিবাজ!

চায়নিজ-ভারতীয়-বাঙ্গালি প্রফেসর, সবার নামেই ছাত্রদের শতশত অভিযোগ। এদের বেশিরভাগের মূলনীতি একই- ছাত্রদের যতবেশি প্রেশার দেয়া হবে, আউটপুট ততই বেশি আসবে। কিন্তু তারা বুঝতে চায় না যে সবসময় এই ঐকিক নিয়ম খাটে না। কাজের মান এক্ষেত্রে খারাপ হয়ে যেতে পারে। তবে আমেরিকান প্রফেসরদের প্রশংসায় সবাই বেশ গদগদ। আমিও যে কয়জনকে দেখেছি বেশ ভাল লেগেছে।

গ্র্যাড লাইফ বেশ ভাল ধরতে পেরেছেন জর্জ চ্যামপিএইচডি কমিক্‌সে একটার পর একটা মজার মজার পর্ব উপহার দিয়েই যাচ্ছেন এই লোক। আরও মজা পাই যখন আমার আশেপাশের ঘটনাগুলোর সাথে কার্টুনগুলো হুবুহু মিলে যায়! মাইনুল ভাই ফেইসবুকে বেছে বেছে কিছু শেয়ার করেছেন। তার কয়েকটা এখানে দিলামঃ

বিঃ দ্রঃ আমি আর জেমিন ফিফা খেলার জন্য নতুন জায়গা খুঁজছি। অফিসটা আর নিরাপদ নয়…

(চলবে)

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

আমেরিকানদের আমি দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছি। একদল আমার দূর্বল ইংরেজীতে বলা কথা চট্‌ করে বুঝে ফেলে। আরেক দলকে প্রায় প্রতিটা বাক্য বা শব্দই দুইবার করে বলতে হয়। সামান্য বিকৃত উচ্চারণও তারা ধরতে পারে না। বিকৃত বলছি এই কারণে যে আমরা বাঙ্গালিরা বা ভারতীয়রা ইংরেজী লেখাতে যতই পারদর্শী হই না কেন উচ্চারণে অবশ্যই কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কম বা বেশি টানের ব্যাপারও থাকে। দেখা গেছে যারা আমার কথা সহজেই বুঝে যায় তারা অন্যান্য দেশের প্রচুর মানুষের সাথে মিশেছে কিংবা পরিবারের বাপ-দাদারা অন্য দেশ থেকে আগত। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন আঞ্চলিকতায় ইংরেজী শুনে অভ্যস্থ। অপরদিকে ওরা যা বলে সামনাসামনি প্রায় সবই বোঝা যায়, মাঝেমাঝে ফোনে একটু কষ্ট হয়। তবে সেটা তেমন সমস্যা না, দৈনন্দিক কথাবার্তা এমনিতেই বোঝা যায়। আমার সমস্যা হয় যখন কয়েকজন আমেরিকানের সাথে গ্রুপে অবস্থাণ করি। দেখা গেল হঠাৎ কেউ একজন মজা করে একটা কৌতুক করল, সবাই হাসছে। কিন্তু ভাষার মারপ্যাঁচের কারণে আমি ধরতে পারিনি!

ব্যাপারটা আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করি। বাংলাতেও আমরা যখন মজা করে একটা কথা বলি তখন সেটা বইয়ের ভাষার মত ব্যাকরণ মেনে চলে না। কিংবা আমরা ফেইসবুকেও যখন মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য চালাই তখন সেখানে আঞ্চলিকতা, বিকৃতি, শব্দবিন্যাসে পরিবর্তন সবকিছুই থাকে। আমার কাজিন বাছির এস.এস.সি. তে খুব ভাল রেজাল্ট করে স্কুল থেকে গ্রামের মেঠোপথ ধরে বাসায় যাচ্ছে রিকশায় করে। তো তার ভাল রেজাল্টের কথা সবাই ততক্ষণে জেনে গেছে। দূরে তার কিছু বন্ধু দলবেঁধে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল। একজন মজা করে চিৎকার করে উঠল, ‘কীরে বাছির, ভালা রেজাল্ট কইরা তো অক্করে রিশ্‌কা দা হাডছ…।’ এখন এই বাক্যটা অনুবাদ করে বিদেশী কাউকে বোঝানো কতটা কষ্টকর হবে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। সেদিন যেমন ল্যাবে আমি আর প্যাটি কাজ করছি। স্টিভ দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় চট করে কিছু একটা বলে গেল। আমি না বুঝেই মুচকি হাসলাম। পরে প্যাটিকে জিজ্ঞেস করলাম স্টিভ কি বলে গেল? প্যাটি হেসে বলল, ডৌন্ট ওয়ার্ক টূ হার্ড। মানে কাজ করতে করতে শহীদ হয়ে যাইও না আরকি। প্রথমত, স্টিভ বের হয়ে যাওয়ার সময় দরজার ঐদিক থেকে আমি কোন কথাই আশা করি নাই যে কান খাড়া করে রাখব। তার উপর সে কথাও বলে অর্ধেক মুখের ভিতর রেখে, খুব সামান্যই ঠোঁট নড়ে! তবে বুঝতে পারলে হয়ত সাথে সাথে প্রত্যুত্তরে বলা যেত- আরে মিয়া তোমাকে দেখেই তো আমরা কাজ করা শিখি বা এই জাতীয় কিছু। আর একথা বলাই বাহুল্য যে কৌতুক বা মজার কোন কথা সাথে সাথে ধরতে না পারলে বা উত্তর দিতে না পারলে আপনি বন্ধুদের মাঝে ‘সেন্স অব হিউমার কম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যেতে পারেন!

পুরো আমেরিকা জুড়ে নাকি ইংরেজীতে অনেক রকম আঞ্চলিক টান। সেটাই স্বাভাবিক, এত বড় দেশ। আমাদের ছোট দেশটাতেই তো কত রকম আঞ্চলিক ভাষা। শুনেছি আলাবামার ঐদিকের লোকদের কথা বোঝা নাকি খুবই কষ্টকর। আমার এক প্রফেসর আছেন, উনি ক্লাসে অনেক কৌতুক করেন, ব্যবহার করেন প্রচুর স্ল্যাং। অন্যান্য প্রফেসরদের দরজায় যেমন বিভিন্ন রিসার্চের গ্রাফ বা ছবি লাগানো থাকে, সেখানে উনার দরজায় লাগানো কমিক্‌স বইয়ের রঙ্গিন পাতা! প্রথমদিন উনার রুমে গিয়ে বেশ অবাক হয়েছিলাম! বুঝতে পারি উনার ঝুলিতে অনেক গল্প, তবে দুঃখের বিষয় ক্লাসে তার অনেক কথাই ধরতে পারিনা!

সুখের ব্যাপার হল চাইনিজদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। আমার মনে হয় তাদের ভাষাটা এত কড়া যে ওরা সেটা থেকে আর বের হতে পারেনা। তাই ইংরেজী বললেও ওটা হয়ে যায় চাইনিজ সুরে। অনেক বছর ধরে আমেরিকায় থেকেও তাই তাদের তেমন উন্নতি হয় না। অ্যারাবিয়ানরা ত ত করে সবকিছুতে। সবকিছু বিচার করে আমরাই ভাল আছি আসলে। বাংলা স্বরবর্ণ এত শক্তিশালী যে আমরা চাইলে প্রায় সবধরণের উচ্চারণই করতে পারি। বাঙ্গালিরা বা ভারতীয়রা এখানে আসামাত্রই খুব দ্রূত ইংরেজী বলছে দেখলে অনেকেই প্রশ্ন করে, তোমরা মাত্র এসেছ অথচ এত ভাল ইংরেজী বলছ কী করে! তাদের ধারণা এখানে সবাই এসে থাকতে থাকতে ইংরেজী শেখে। আমাকেও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে অনেকবার। তখন আমি ব্যাখ্যা করে বলি যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গোড়া থেকেই গ্রামারসহ বাধ্যতামূলক ইংরেজী শিখতে হয়। তাছাড়া ব্রিটিশরা দুইশ বছর শাসন করাতে আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যেও ইংরেজীর প্রচলন ভালই ছিল।

যারা ইংল্যান্ডের মানুষদের ইংরেজী শুনেছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে তা আমেরিকান ইংরেজীর চেয়ে একটু অন্যরকম। সেখানে আবার লিভারপুলের ইংরেজী এতই বিকৃত যে অন্যান্য ইংলিশদেরও নাকি বুঝতে সমস্যা হয়। শেষ করি একটা মজার ঘটনা (যদিও অফটপিক) দিয়ে। ইংল্যান্ডে যেদিন ক্লাব ফুটবলের ম্যাচগুলো থাকে সেদিন খেলা শেষে আশেপাশে অনেক ভাংচুর হয়। লাঠিসোটা নিয়ে হামলাও হয় প্রতিপক্ষের উপর। ডার্বি ম্যাচের আগে একই পরিবারে যদি বাবা-মা দুই দলের সমর্থক হন, তাহলে সকাল থেকেই নাকি তাদের মধ্যে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় (রেফারেন্সঃ আরশাদ ভাই)! কখনো কখনো দলবেঁধে স্টেশনে ওঁত পেতে থাকে- ট্রেন থেকে নামামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিজিটিং ফ্যানদের উপর। এটাতো জানা কথাই যে ইংল্যান্ডের ফুটবল ফ্যানরা তাদের আমজনতার মত ভদ্র না। তো সিফাত আপু তখন ম্যানচেস্টারে থাকতেন। একদিন খেলাশেষে উনি কি কাজে যেন রাস্তায় বের হয়েছেন। হঠাৎ একদল উন্মত্ত সমর্থক লাঠিসোটা নিয়ে ঘিরে ধরল তাকে। জানতে চায় উনি কোন দলের সমর্থক। একেতো এরা কোন দল সেটা উনি বুঝতে পারছেন না তার উপর ক্লাব ফুটবলের উপর তার তেমন কোন ধারণা বা আগ্রহ নেই। তবে নিশ্চিতভাবেই ভুল উত্তর দিলে কপালে খারাবি আছে। উনি বুদ্ধি করে এমন একটা ভান করলেন যে এরা কী বলছে কিছুই বুঝতে পারছেন না। আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েও দিলেন যে উনি ইংরেজী একেবারেই বোঝেন না, সবেমাত্র ইংল্যান্ডে এসেছেন। সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন হুলিগানদের হাত থেকে। ইংল্যান্ডে যারা আছেন বিপদে পড়লে এই টেকনিক ট্রাই করে দেখতে পারেন।

(চলবে)

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.