(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

শায়ের খান কল্লোলের একটা রম্যরচনা পড়েছিলাম- ‘রোযা যাদের রোজ-আ’, মানে রোজ আহার আর কী। ফাঁকিবাজ একদল লোক রোযা ভাঙ্গার পায়তাঁরা করতে করতে অতি সন্তর্পণে ঢুকে পড়ল কালো কাপড়ে ঢাকা এক রেস্টুরেন্টে। এখন কোন কারণ ছাড়া হুট করে তো আর রোযা ভেঙ্গে ফেলা যায় না। ধর্মের নানাবিধ আইন কানুন নিয়ে উচ্চমার্গীয় আলোচনা করতে করতে একজন বের করে ফেলল- মিষ্টি খাওয়া যেহেতু সুন্নত,  সেই সুন্নত পালন করতে গিয়ে ফরজের সাথে কনফ্লিক্টটাই পুরো সিস্টেমের একটা লূপহোল। তো সেই সুন্নত পালন করার নিমিত্তে তারা অর্ডার দিয়ে বসল প্লেটভর্তি মিষ্টি! শুধু মিষ্টিতে কী আর দুপুরবেলা পেট ভরে? সেই সেহরী থেকে না খাওয়া! একজন বেশ চিন্তিতমুখে প্রশ্ন তুলল, ‘আচ্ছা পরটা জিনিসটা কি জাতীয়- ঝাল না মিষ্টি?’ কথাটা লুফে নিল আরেকজন- ‘ভাল জিনিস মনে করেছেন তো। পরটা হল নিউট্রাল খাবার, এটাকে ঝালের সাথে খেলে ঝাল আর মিষ্টির সাথে খেলে মিষ্টি বলে গন্য করা যায়।’ এরপর আর যায় কোথায়- ‘ওয়েটার, তিনটা করে পরটা সবার জন্য। এদিকে বিশ্বজয়ীর ভঙ্গিতে সবার দিকে তাকালেন যিনি এইমাত্র পরটার ক্লাসিফিকেশান আবিষ্কার করলেন। ভুরিভোজের পর বের হয়ে একজন স্বভাবসুলভভাবে এগিয়ে গেলেন পানের দোকানের দিকে। চিৎকার করে উঠলেন আরেকজন, ‘না না মশাই, ঐ কাজটি ভুলেও করবেন না। রোযার দিনে পানাহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ!!!’

রমজান আসলেই সংযমের চেয়ে বরং খাবার দাবারের পরিমাণ আমাদের বেড়ে যায় বলে ভাবলাম এই মজার গল্পটা শেয়ার করি। এবারই প্রথম রমজান মাস কাটাচ্ছি দেশের বাইরে। চৌদ্দ ঘন্টা রোযা রাখতে হবে শুনে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম প্রথমে। গতকাল জাহিদ ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল, জানালেন কানাডায় উনাদের আঠারো ঘন্টা রোযা রাখতে হচ্ছে! এই কথা শোনার পর এখন আর অতটা কষ্ট হচ্ছে না। ল্যাবেই অধিকাংশ সময় কেটে যায়। দিনশেষে আরেফিন ভাই ড্রাইভ করে আমাদের চার-পাঁচজনকে নিয়ে যায় মাইল দুয়েক দূরের এক মসজিদে। ওখানে প্রতিদিন ফ্রী ইফ্‌তার আর ডিনার। মিড্‌ল ইস্টের লোকজনই বেশি দেখলাম। খাবার বেশ ভাল, ওইদিকের রান্নাই বোধহয়। আশেপাশের এলাকা থেকে একেক দিন একেকজন খাবার নিয়ে আসে। মাসের ত্রিশ দিনই নাকি বুক্‌ড! মানে কে কোনদিন খাবার আনবে। মনে হল এই ব্যবস্থা যেন আমাদের মত গ্র্যাড স্টুডেন্টদের জন্যই Laughing

গত কয়েকটা রোযার মাস এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। হলে সিজানই ছিল সার্বিক তত্ত্বাবধানে। তার রুমে প্রতিদিন ইফ্তার করতাম আমরা। সিজান অনেক সময় নিয়ে যত্ন করে বানাতো সালাদ। সজীব বানাতো শরবত। তার বোধহয় নামও হয়ে গিয়েছিল শরবত আলী। আমি খেজুর আর গ্লাস ধুয়েই খালাস! মামুন, রিজওয়ান ইফ্তার কিনে আনতো। আমিও মাঝে মাঝে যেতাম। অনিয়মিত হলেও নিশাত, অয়ন সহ আরও অনেকেই যোগ দিত এই আয়োজনে। পেপারের উপর বিশাল এক পাহাড় হয়ে যেত সবকিছু মেশাতে মেশাতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এই পাহাড় শেষ হতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগতো না। সিজানের এই ইফ্তার খাওয়ার পরে অন্য ইফ্তার আর ভাল লাগতো না। এমনকি বাসারটাও না! ইফ্তার খেয়ে আমরা বসে যেতাম গেইম খেলতে। আমি জয়স্টিক নিয়ে আসতাম (যে জয়স্টিক অন্যদের ধরতে না দেয়াতে সবাই আমার উপর ক্ষ্যাপা ছিল)। তাছাড়া হলের কম্পিউটারগুলো একটা আরেকটার সাথে ল্যানে কানেক্টেড ছিল। তাই অনেকেই একসাথে ফিফা’র ফুটবল খেলতে পারতাম। কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না, তবে একথা সত্যি যে আমরা ইফ্তার খেয়ে বসতাম আর উঠতাম একেবারে সেহরীর সময়! এখানে আমি মাঝে মাঝে আরেফিন ভাইয়ের সাথে বা চায়নিজ কলিগ জেমীনের সাথে দুই এক ঘন্টা যে খেলি, সেটা তাই আর গায়ে লাগে না। মনে হয় এইমাত্রই না বসলাম, অথচ সে উঠে যেতে চাচ্ছে কেন। হলের খুব কাছে হওয়ায় প্রায়ই খালার বাসায়ও চলে যেতাম ইফ্তারের আগে। ওখানেও চলত বাছিরের সাথে ফাইট। তবে বেশিরভাগ সময়ই ওর সাথে হারতাম বলে মেজাজ প্রচন্ড খারাপ করে হলে ফেরত আসতাম। সিজান-সজীবদের কাছে বেশ সতর্কতার সাথে গোপন করে যেতাম যে আমার সাথে বাছিরের ফিফাতে পারফরম্যান্স অনেক ভাল।

অনেকবার ইফ্তার করেছি আমার দুই ছাত্র শাহেদ আর সাইফের বাসায়। ওদের বাসায় গেলে আমাকে প্রচুর খাওয়াত। আর ওদের সাথে এমনিতেও অনেক ফ্রী ছিলাম। একদিন ঠিক করলাম আমি, শাহেদ আর বাছির যাব বুফেতে পিজ্জা খেতে। রমজান মাসেই এই অফার দেয় ওরা। এইরে! রেস্টুরেন্টের নাম ভুলে গিয়েছি। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলাম Frown। যাই হোক, ভোজনরসিক হিসেবে শাহেদের আবার সুখ্যাতি আছে। সাইরেনের সাথে সাথে খাওয়া শুরু করলাম প্রতিযোগীতা করে। শাহেদ ইনিংস শেষ করল এগারোটা পিজ্জা খেয়ে। আমিও কম যাইনি- নয়টা। আর বাছির আমাদের তুলনায় ফেইলই করেছে বলা যায়- মাত্র সাতটা কী সাড়ে ছ’টা। ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করল আমরা কেমন খেতে পেরেছি। শাহেদ বেশ বীরের ভঙ্গিতে বললো, ‘এগারোটা।’ ওয়েটার হেসে বললো, ‘ধরতে পারলেন না তো স্যার। এখানে ষোলটা খাওয়ার রেকর্ড আছে।’ শাহেদের হাসি ধীরে ধীরে মিইয়ে গেল…

হল ছেড়ে দেয়ার পর বাসা ভাড়া করে থাকতাম আমি, অর্জুন, মামুন, শিমুল আর শান্ত। হল পরবর্তী জীবন নিয়ে আরেকদিন লেখা যাবে। অনেক গল্প জমা আছে। তবে ইফ্তার করতে বসলে শিমুলের কথা মনে পড়ে বেশি। গতবছর এইদিনগুলিতে আমি আর শিমুলই বাসায় থাকতাম ইফ্তারের সময়। অর্জুন প্রায়ই তার ভার্সিটিতে থাকত। আমার আর শিমুলের প্রিয় খাবার ছিল গ্রিল চিকেন। আবিষ্কার করেছিলাম দুর্দান্ত এই জিনিসটা ইফ্তারের বুট-পেঁয়াজুর সাথে বেশ ভাল যায়। অর্জুনের আন্দাজ আবার একটু কম-  বাসার তিনজন মাত্র মানুষের জন্য একবার তিনশো টাকার হালিম নিয়ে আসলো। খেয়ে আর শেষ করতে পারি না!

রমজান মাসের স্মৃতি আসলে আরও অনেক আছে। হুড়মুড় করে অনেক কিছুই মনে পড়ছে। আবার অনেক বড়বড় ঘটনা বাদও পড়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন সানরাইজে কোচিং করতে ঢাকায় আসার পর যেবার আমি বিশ দিনব্যাপী টাইফয়েডে পড়লাম, সেটা ছিল রমজান মাস। ছিলাম মিরপুরে চাচার বাসায়। ওদের এত সেবাযত্ন পেয়েছি তখন যে তা না হলে হয়ত আমার ঐ অবস্থায় ভার্সিটিতে চান্স পাওয়াই হত না।

শেষ করি। অনেক প্যাঁচাল হল। বন্ধুরা যে যেখানে আছে ভাল থাকুক। খুব ভাল।

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’-তে দেখানো একটা ক্লিপ মনে পড়লঃ দুই লোক ব্যাপক খাওয়া দাওয়ার পর খোদ হোস্টকেই বলছে, জ্বী আমরা বরপক্ষ। চোখ বড় বড় করে হোস্ট বলল, এইটাতো আমার ছেলের আকীকা অনুষ্ঠান! এইরকম দাওয়াত ছাড়া কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে ঢু মারার সৌভাগ্য (!) কখনও হয়নি আমার; তবে এমন দুষ্ট ছেলেপেলের দল নিশ্চয়ই খুঁজলে পাওয়া যাবে যাদের প্রতি শুক্রবারই কাটে কোন না কোন কমিউনিটি সেন্টারে! কিছুদিন আগে এরকমই এক কাহিনী নিয়ে এক মুভি দেখলাম- Wedding Crashers. জন আর জেরেমী নামে দুই বন্ধুর শখ হল অবসরে এভাবে বিয়ে খেয়ে বেড়ানো। প্রচুর খাবার, অঢেল বীয়ার, নাচ-গান ছাড়াও তাদের টার্গেট থাকে বিয়েবাড়ি’র সেরা সুন্দরীদের সাথে ভাব জমানো এবং স্বল্পস্থায়ী (একদিন) একটা রিলেশানে যাওয়া! নেটে দেখলাম এদেরকেই Wedding Crasher বলা হয়। গুরুপ্রদত্ত এ সংক্রান্ত ১১৫ টি পরীক্ষিত বিধিনিষেধ জন আর জেরেমী’র মুখস্থ এবং কখনই এর অমান্য তারা করে না। ফলশ্রুতিতে খ্রিস্টান-ইহুদি-চায়নিজ-হিন্দু সব ধরনের বিয়েতেই তারা স্বল্পসময়ের মাঝেই পার্টির জনপ্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং প্রতি উইকএন্ডেই সফলভাবে জয় করে আসছে অজস্র সুন্দরীর হৃদয়। তো এই মুভি দেখে যতটা মজা পেয়েছি, পরে তারচেয়ে অনেক বেশি মজা পেয়েছি তাদের পরীক্ষিত সেই বিধিনিষধের তালিকা পড়ে। এখানে কিছু শেয়ার করলাম (মূল লিস্টের লিঙ্ক):


Rule #1: Never leave a fellow Crasher behind. Crashers take care of their own.
Rule #2: Never use your real name.
Rule #3: When crashing an Indian wedding, identify yourself as a well-known immigrant officer or a county lawyer.
Rule #5: Never let a girl come between you and a fellow crasher.
Rule #6: Do not sit in the corner and sulk. It draws attention in a negative way.
Rule #12: When it stops being fun, break something.
Rule #14: You’re a distant relative of a dead cousin.
Rule #16: Always have an up-to-date family tree.
Rule #18: You love animals and children.
Rule #19: Toast in the native language if you know the native language and have practiced the toast.
Rule #34: Be gone by sunrise.
Rule #36: Your favorite movie is “The English Patient”.
Rule #38: Don’t waste your time on girls with hats; they tend to be very proper.
Rule #40: Dance with old folks and the kids. The girls will think you’re “sweet.”
Rule #42: Try not to break anything, unless you’re not having fun.
Rule #45: Always remember your fake name! Rehearse it in advance and make sure you know your fellow Crasher’s code-name as well!
Rule #46: The Rules of Wedding Crashing are sacred. Don’t sully them by “improvising.”
Rule #49: Always work into the conversation: “Yeah, I have tons of money. But how does one buy happiness?”
Rule #55: If pressed, tell people you’re related to Uncle John. Everyone has an Uncle John.
Rule #56: Don’t fixate on one woman. ALWAYS have a back-up.
Rule #58: The Ferrari’s in the shop.
Rule #59: If two rival crashers pick the same girl, the crasher with the least seniority will respectfully yield.
Rule #62: No more than two weddings a weekend. More and your game gets sloppy. You’ll also attract unwanted notice.
Rule #63: Bring an extra umbrella when it rains. Courtesy opens more legs than charm.
Rule #65: When your crash partner fails, you fail. No man is an island.
Rule #66: Smile! You’re having the time of your life.
Rule #68: Dance with the Bride’s grandmother.
Rule #71: Research, research, research the wedding party. And when you are done researching, research some more.
Rule #73: Keep interactions with the parents of the bride and groom to a minimum.
Rule #76: No excuses. Play like a champion.
Rule #79: The tables furthest from the kitchen always get served first.
Rule #84: Stay clear of the wedding planner. They may recognize you and start to wonder.
Rule #86: Shoes say a lot about the man.
Rule #87: Always choose large weddings. More choice. Easier to blend.
Rule #88: You’re from out of town. ALWAYS.
Rule #90: Of course you dream of one day having children.
Rule #92: Tell the bride’s friends and family that you are family of the groom and visa-versa.
Rule #93: Only take one car. You never know when you’ll need to make a fast escape.
Rule #101: Avoid women who were psychology majors in college.
Rule #108: Know your swing and salsa dancing. Girls love to get twisted around.
Rule #113: Don’t look for opportunities; make them.

(মূল লেখাঃ সচলায়তন)

জীবনে আঁতেল কম দেখিনি; কিন্তু আজ যা দেখলাম বোধ করি তাকে আঁতলামির চেয়ে বোকামি বলাটাই শ্রেয় হবে। ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য একটু পেছন থেকে আসি। দেশের বাইরে পড়তে আসার পর অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি- ওপেন বুক এক্সাম, টেক হোম এক্সাম, অনলাইন এক্সাম ইত্যাদি। পরীক্ষা ছাড়াও হাবিজাবি অনেক কিছুর কম্বিনেশানের পর পরিসমাপ্তি ঘটে একটি কোর্সের। যেমন গত সেমিস্টারে আমার একটা কোর্সে ছিল দশটা হোমওয়ার্ক, চারটা পেপার রিভিউ, একটা প্রজেক্ট, একটা সফটওয়্যার, দুইটা ওপেন বুক এক্সাম, একটা টেক হোম এক্সাম এবং একটা ফাইনাল এক্সাম! সবশেষে একটা প্রেজেন্টেশান জুড়ে দিলেও অবাক হতাম না। আর ওপেন বুক হলেও বইটির পুরুত্ব ছিল পাক্কা তিন ইঞ্চি, পৃষ্ঠা সংখ্যা আঠারশো। বুঝতেই পারছেন এই বই ওপেন আর ক্লোজড্‌ একই কথা! কাজের সময় কিছুই খঁজে পাওয়া যায়না। তো এবার এমনই এক স্ট্যাটিসটিক্‌স কোর্সে টেক হোম এক্সামের জন্য দেয়া হলো দুই সপ্তাহ। পরীক্ষা অনলাইনে, এক এক করে তেইশটা প্রশ্ন আসবে। শেষ করলে মার্কস দেখা যাবে সাথে সাথেই। স্বভাবতই ডেডলাইনের দুইদিন আগে আমি বসলাম পরীক্ষা দিতে। কিছু পূর্বজ্ঞান, কিছু বই পড়ে আর কিছু বিশেষ উপায় অবলম্বন করে আমি দিনশেষে এক্সাম সাবমিট করলাম। পেলাম একশতে সত্তুর। বলা যখন শুরু করে দিয়েছি বিশেষ উপায়টাও বলে ফেলি তাহলে। যেকোন কিছুই গুগলে সার্চ করে দেখা একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই পরীক্ষা থেকে বের হয়ে হয়ে আমিও প্রশ্ন হুবহু কপি-পেস্ট করে তুলে দিচ্ছিলাম গুগলে। ফলাফল অবিশ্বাস্য- একটা ফোরামে এই প্রশ্নগুলোই (চার-পাঁচটা) সমাধান করে দেয়া। স্ট্যাটিসটিক্‌স প্রায় সব ডিসিপ্লিনের স্টুডেন্টদেরই করতে হয়, তাই ইন্টারনেটে এর ব্যাপ্তিও অনেক। পরে শুনলাম অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে সূত্রটির জনক স্বয়ং কোন এক ফোরামে বসে সবার সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছেন। তো ঐ ফোরামে পোস্টের তারিখ মিলিয়ে বুঝলাম আমার ক্লাসেরই কেউ একজন পরীক্ষার প্রশ্নগুলো পোস্ট করে উত্তর বের করে এনেছে। ট্যালেন্ট! কী সুন্দর দুই সপ্তাহ কাজে লাগিয়ে ফেলল। তবে না, আমার ব্লগ তাকে উদ্দেশ্য করে শুরু হয়নি। প্রফেসর আমাদের বলে দিয়েছেন যে আমরা যতবার ইচ্ছে পরীক্ষাটা দিতে পারবো। তার তো আর কষ্ট নেই, খাতা কাটছে কম্পিউটার। কিন্তু কাউন্ট হবে ডেডলাইনের আগে সর্বশেষ নম্বরটি। পরদিন আমি আবার পরীক্ষা দিতে বসলাম। কিছু ডাটা আর সূত্র কেবল এদিক সেদিক। এবার পেলাম আশি। নাহ্‌ আর দেয়ার ইচ্ছে নেই, বিশ্বকাপ-মুভি কত কাজ…

আজ সকালে ক্লাসে গিয়ে দেখি বৃদ্ধ প্রফেসর প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছেন। বললেন তোমাদের আনলিমিটেড চান্স দিলাম বলে এই কাহিনী করলা? আমরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি- ঘটনা কী! জানালেন- কেউ দশবার, কেউ বিশবার পরীক্ষাটা দিয়েছে তাও মেনে নেয়া যায় যেহেতু সময় ছিল চৌদ্দ দিন। তাই বলে একজন চৌষট্টিবার দিবে? আমি ভাবলাম কানে ভুল শুনছি। নাহ্‌ আবারও বললেন- চৌষট্টিবার! এ কোন দেশে এলাম! সেই স্টুডেন্টই বা কোন দেশের? ক্লাস থেকে বের হয়ে আমরা কয়েকজন কথা বলছিলাম। অনেকেই আমার মত দুইবার দিয়েছে। নব্বইয়ের উপরেও পেয়েছে কেউ কেউ। আমাদের কৌতূহলকে দমানোর জন্যই বোধহয় এক মহিলা নিজে থেকেই এগিয়ে এলেন আমাদের সামনে। বয়স পয়ত্রিশ তো হবেই। জানালেন ক্লাসে যার কথা আলোচনা হয়েছে তিনিই সেই স্টুডেন্ট! আমি প্রথমেই তার ধৈর্য্যের ভূয়সী প্রশংসা করে পরে জানতে চাইলাম যে এতবার ট্রাই করার পেছনে প্রেরণা (কারণ) কী ছিল। উনি যা বললেন সেটা বোধহয় পাঠকরা এতক্ষণে আন্দাজ করে ফেলেছেন। মাল্টিপল চয়েজে একবার ‘এ’ একবার ‘বি’ একবার ‘সি’ ইত্যাদি দিয়ে উনি সাবমিট করে যাচ্ছিলেন আর মার্কস দেখছিলেন যে কোন কম্বিনেশানে সবচেয়ে ভাল নম্বর আসে। নির্ঘাত প্রশ্নটাই পড়ে দেখেননি। যাই হোক বেচারি শেষ করলো পচাঁশি দিয়ে। শুরু করেছিলেন কত দিয়ে ওটা জিজ্ঞেস করতে মনে নেই। চৌষট্টি পর্যন্ত যেতে যেতে নিশ্চয়ই ভুলে গিয়েছিলেন নিজেও!

(মূল লেখাঃ সচলায়তন)

বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে ব্রাজিলিয়ান এক তরুণীর আশেপাশে বসে ক্লাস করছি আজকাল। না মানে ইয়ে, প্রিয় দলের পাশে থেকে সাপোর্ট করা আর কি…

মজার ব্যাপার ঘটল সেদিন স্ট্যাটিসটিক্স ক্লাসে। প্রথম দিনই প্রফেসর এসে বললেন, ‘এখানে সকার দেখে কে কে?’ আমরা চার-পাঁচ জন কেবল হাত তুললাম ত্রিশজনের মধ্যে। একেবারে সামনে বসেছিলাম সেদিন। বৃদ্ধ প্রফেসর বেশ স্নেহের দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। আমি মনে মনে বলি, কেল্লা ফতে…তোমাকে এই লাইনেই কাবু করতে হবে! সামারের প্রথম ক্লাস, কোর্স প্ল্যান নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। ও মা! বিশাল প্রজেক্টরে সে খুলে বসল বিশ্বকাপের ফিক্সচার! ঘটনা হল তার নিজের দেশ চিলির খেলাগুলো পড়েছে আমাদের ক্লাস টাইমে। তাহলে উপায়? উপায় আবার কী; সাফ জানিয়ে দিল ঐ ক্লাসগুলো হবেনা। ক্লাস-পরীক্ষা তো প্রতি সেমিস্টারেই আসে, কিন্তু বিশ্বকাপ তো আর মুখের কথা না। গ্রেটেস্ট ইভেন্ট অন আর্থ! তার দেশ ‘চিলি’ শুনে ততক্ষণে আবার আমি মনে মনে ক্যালকুলেশন করে ফেলেছি- তার অফিসে গিয়ে ইভান জামোরানো আর মার্সেলো সালাস এর গল্প জুড়ে দিতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে যে জা-সা জুটির বীরত্ব্ব সম্পর্কে বাঙালিরাও ওয়াকিবহাল। এখানে শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ রাখাটাকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। গত সেমিস্টারে ভাল শিক্ষা হয়েছে। প্রফেসরের রুমে একবারও কোন সমস্যা নিয়ে যাইনি বলে সে বেশ ক্ষ্যাপা। বুঝে নিয়েছিল যে তার ঐ কোর্স নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই!

যাই হোক, সকার নাকি ফুটবল এ নিয়ে বেশ সমস্যা হচ্ছে। আমি যদি বলি ফুটবল, তারা ধরে নেয় আমেরিকান ফুটবল (রাগবি) এর কথা বলছি। গল্প নিয়ে যায় ঐদিকে। আরেকজনের সাথে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের কথা বলছি, সে ভাবল ব্রাজিলিয়ান ফুড। আমাকে আশেপাশের রেস্টুরেন্টগুলোর ফিরিস্তি দিয়ে দিল যেখানে ব্রাজিলিয়ান খাবার পাওয়া যায়…

একটা দাওয়াত পেয়ে গিয়েছিলাম ‘সুপার বোল’ এর ফাইনাল দেখতে। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। তাই মানুষজন বাসায় বাসায় জড়ো হয়েছিল। যারপরনাই বিরক্ত! তোরা রেসলিং খেললেই পারিস, এত যখন গায়ের জোর।

ইফতেখার আহমেদ ফাহমির ‘ফাউল’ নামক নাটকটি যারা এখনো দেখেন নি বিশ্বকাপের প্রাক্কালে দেখে ফেলতে পারেন। আমাদের দেশের মহল্লা বা পাড়াগুলোতে বিশ্বকাপের যে উম্মাদনা তার পুরোটাই উঠে এসেছে। নাটকে গৃহকর্তা তরকারীতে আগামী একমাস হলুদ দেয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কারণ ‘হলুদ’ রঙ তার দুই চোখের বিষ। বাংলাদেশের কমন যে লুঙ্গি তার রং আর্জেন্টিনার পতাকার কাছাকাছি। তাই এই লুঙ্গি নিয়েও সে গর্বিত!

শেষ করি বন্ধুর কাছে শোনা মজার একটা ঘটনা দিয়ে। গত বিশ্বকাপের পর ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান গ্রামীন ব্যাঙ্ক এবং ফ্রান্সের ড্যানোন কোম্পানীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিল। গ্রামীন ব্যাঙ্কের কার্যক্রম দেখতে গিয়ে গ্রামের মহিলাদের সাথে কথা হচ্ছে। মাঝখানে দোভাষী। বেমক্কা এক মহিলা তাকে প্রশ্ন করে বসল, ‘মাথা দা ঢুসা দিসিলেন ক্যারে?’ বেচারা দোভাষী আর কী অনুবাদ করবে। অনেক ভেবে চিন্তে সে অনুবাদ করল- ‘বিশ্বকাপ ফাইনালে আপনার রহস্যময় আচরণের কারণ কি?’

(মূল লেখাঃ সচলায়তন)

ভয়াবহ একটা দিন পার করে আসলাম আজ। না না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি; শরীরের উপর দিয়ে ধকল গেছে এই যা। রিসার্চ গ্রুপের পোস্ট ডক্ আম্মারিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাকে বাসার সামনে থেকে পিক্ করার কথা। ঘুম থেকে উঠে পড়লাম একঘন্টা আগেই। প্রতিদিন রাত জেগে জেগে অভ্যাস এমন হয়ে গেছে যে চাইলেও আগে আগে ঘুমোতে পারিনা। কীভাবে কীভাবে যেন দুইটা-তিনটা বেজে যায়। কিছু মানুষ আছে না যখন ইচ্ছে তখনই ঘুমোতে পারে? মাঝে মাঝে ভাবি এরকম হতে পারলে মন্দ হত না। আমার বন্ধু অর্জুনকে দেখতাম- বিছানায় শটান্ হয়ে শোয়ার সাথে সাথেই ঘুম! তার কাছেই শুনেছি যে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যুদ্ধের মাঝেই ঘোড়ার পিঠে টুক্ করে ঘুমিয়ে নিতেন। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন এই দশ মিনিটের ঘুম নাকি খুব কার্যকর। জানিনা কতটা সত্যি, তবে মাঝে মাঝে হঠাৎ ক্লাসে কিছুক্ষন ঘুমিয়ে উঠলে যে সাংঘাতিক ফ্রেশ লাগতো তাতে কোন সন্দেহ নেই!

আগের রাতের ভাত গরম করে মাংস আর ডাল দিয়ে খেয়ে নিলাম। এমনিতেই এত সকালে খাবার গলা দিয়ে নামতে চায়না, তার উপর ভাত। কিন্তু খেতে তো হবেই, একমাত্র ভাতই পারে আমাকে পরবর্তী আট দশঘন্টা ক্ষুধামুক্ত রাখতে! যাচ্ছি আমরা সমুদ্রে- গালফ্ অব মেক্সিকো’র ধারে টাম্পা বে’তে। তিনজন মিলে ওয়াটার স্যাম্পল কালেক্ট করব।

টিফিন হিসেবে ভেজে নিলাম কয়েকটা বোম্বাই টোস্ট। পরে নৌকায় বসে সবাই মিলে খাওয়ার আগে বলছিলাম যে প্রবাস জীবনে রান্নাবান্নায় এখনো আমার ‘ট্রায়াল এন্ড এরর্’ মেথড চলছে। আম্মারিন কথাটা লুফে নিল, একটা টোস্ট হাতে নিয়ে বললো- ‘হোপ দিস্ ইজ নট দ্যা এরর্’। লোকটা খুব মজার। সেই কবে পি.এইচ.ডি. শেষ করে ফেলেছে অথচ বয়সে মনে হয় আমাদের চেয়ে ছোট। এই থাই-চাইনিজ-জাপানীজ লোকগুলার বয়স বোঝা দায়। কখোনই মেলাতে পারিনা!

গাড়ী ভর্তি ইকুইপমেন্ট নিয়ে আমরা রওনা দিলাম টাম্পা বে’র উদ্দেশ্যে। রাতে মাত্র চার ঘন্টা ঘুমালেও প্রথমবারের মত সমুদ্রে যাচ্ছি ভেবে বেশ উত্তেজিত আমি। দুই ঘন্টা পর পৌঁছলাম সমুদ্রের পাড়ে। প্রায় পনের ফুট লম্বা একটা স্পিড বোট ভাড়া করা হল। আট ঘন্টার জন্য কোম্পানীকে দিতে হবে সাড়ে পাঁচশ ডলার। বোটম্যান এর নাম র‌্যান্ডি। বয়স ত্রিশ এর মত হবে। আমাদেরকে দেখে বেশ খুশি হয়ে বলল, ‘দ্যাট্‌স গ্রেট, অ্যা’ম পার্ট অব ইওর রিসার্চ দ্যান’।

প্রথম আধ্‌ঘন্টা ভালই লাগল। সমুদ্রের বেশ ভেতরে চলে এসেছি ততক্ষণে। তারপরই শুরু হল প্রচন্ড বাতাস আর বড় বড় ঢেউ। আমাদের নৌকা বেশ বড় আর মজবুত, ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। আমি আর ন্যাট দুজনের কেউই এই পরিবেশের সাথে পরিচিত নই। প্রতি বিশ মিনিট পরপরই আমরা পাল্লা দিয়ে বমি করতে লাগলাম। র‌্যান্ডি আমাদের একটা টেকনিক শিখিয়ে দিল- দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকলে নাকি এরকম হবেনা। কথা সত্যি, খারাপ লাগা কিছুটা কমে।

আমাদের কাজ হল প্রতি একমাইল পর পর স্যাম্পল নিয়ে কিছু প্যারামিটার টেস্ট করা, অবশিষ্ট স্যাম্পলের পি.এইচ. অ্যাডজাস্ট করে বরফে ঢুকিয়ে রাখা যেন ভার্সিটির ল্যাব পর্যন্ত আনতে আনতে ভাল থাকে। তিনটা স্যাম্পল নেয়ার পর আমরা জানতে পারলাম আম্মারিন এরকম পঞ্চাশটা নিতে চায়। শুনে আমি আর ন্যাট একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। একেতো বমির ধাক্কা, তার উপর প্রতিটা স্যাম্পলের উপর কাজ। নাহ্! এ অসম্ভব- তাই বলে পঞ্চাশটা! আম্মারিন বললো এই ডাটা নাকি কোন্ সফট্ওয়্যারে ইনপুট দিতে হবে, তাই বেশি করে লাগবে। এমনিতেই প্রজেক্টটা আমার না, তার উপর প্রফেসর যখন বলেছিল ‘আম্মারিনের সাথে তুমি যেতে পার, হ্যাভ ফান’ তখন কেন যে এত উৎসাহ দেখিয়ে রাজি হয়েছিলাম। নিজের উপরই রাগ হচ্ছিল।

পাঁচটা-দশটা এভাবে করে পনেরটা করে ফেললাম। বমি আর হচ্ছে না, ঢেউ কমে যাওয়া নাকি দিগন্তের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাজ করার কারণে জানি না। কিন্তু আরও তো পয়ত্রিশটা বাকি আছে। নাহ্ এ কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। পাশাপাশি এও ভাবছিলাম যে এটাই আমার জীবনে সবচেয়ে খারাপ দিন কী না! এরপর একটু রক্ষা পাওয়া গেল, লম্বাটে একটা চরে আমাদের নৌকা থামলো। এত সরু চর সমুদ্রের মাঝখানে থাকতে পারে ধারণা ছিলনা। আমরা ডাঙ্গা পেয়ে সাথে সাথে নেমে পড়লাম। এই প্রথম উপলব্ধি করলাম জাহাজে মানুষের শুরুতে কত কষ্ট হয় খাপ খাওয়াতে। শুনেছি ওখানে ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে রুমে আটকে রাখা হয়। হায় খোদা দিগন্ত দেখারও সুযোগ নেই!

র‌্যান্ডি বলার পর খেয়াল করলাম এই চরটা আসলে বালির না। পায়ের নিচে কেবল ঝিনুক আর ঝিনুক। আশ্চর্য, শুধু ঝিনুকেরও দ্বীপ হয়! অনেক রকম পাখিরও আস্তানা এটা। র‌্যান্ডি নাকি প্রায়ই তার বাচ্চাদের নিয়ে বিকেলে চলে আসে এখানে। কী সৌভাগ্য তাদের!

এরপর পানির গভীরতা খুব বেশি ছিলনা। বাতাস-ঢেউ দুটোই পরিমিত। তাই সী-সিকনেস কাটিয়ে উঠেছি আমরা দুজনেই। মনকে খুশি করার জন্য প্রবোধ দিলাম- বাতাস, ঢেউ এইগুলা না বরং আমরাই খাপ খাইয়ে নিয়েছি…

ঘুরেফিরে মনে পড়ছিল তিন গোয়েন্দার ‘অথৈ সাগর’ বইটার কথা। একসময় কী মন্ত্রমুগ্ধের মতই না পড়তাম সমুদ্রযাত্রার গল্পগুলো। ‘দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’র কথাই বা বাদ দেই কেন।

ত্রিশটা স্যাম্পল কালেক্ট করার পর আমাদের সময় শেষ। আমার আর ন্যাট এর আনন্দ দেখে কে। আম্মারিনকে এতেই খুশি থাকতে হল। পরে সে নিজেও বলছে যে আমরা যদি পঞ্চাশটা টার্গেট না করতাম তাহলে এতগুলা নিতে পারতাম না। র‌্যান্ডিও স্বীকার করল যে আগে কখনো সে একদিনে পুরো টাম্পা বে ঘোরেনি। আজ তার ফুয়েল খরচ ছিল সর্বাধিক।

তীরে ফেরার পথে সাগর পাড়ে অনেকগুলি বাড়ি চোখে পড়ল। র‌্যান্ডি বললো এই বাড়ির দাম অনেক বেশি। কারণ একটাই- সাগর। আরও লক্ষ্য করলাম প্রতিটা বাড়ির সামনে হরেক রকমের নৌকা, স্পিড বোট, বজরা ইত্যাদি। এত রকম নৌযান আমি জীবনে দেখিনি। র‌্যান্ডি ব্যাখ্যা করে বলল, যদি বোটের মালিকই না হতে পারে তাহলে আর এত খরচ করে সাগর পাড়ে থাকা কেন? পানি তো মানুষ সুইমিং পুলেই পায়। তাই কেবল সৌখিনরাই এদিকে থাকে। আরও মজার ব্যাপার হল পাড়া-পরশীদের মাঝে একটা প্রতিযোগিতা কাজ করে- কে কার চেয়ে আকর্ষনীয় বোট কিনতে পারে। আমরা যেটা ভাড়া করেছি সেটার দামই নাকি বিশ হাজার ডলার। এলাকার সবচেয়ে নামকরা বোটের কাছে নিয়ে গেল ও। নৌকা বললে ভুল হবে, ছোটোখাট একটা জাহাজ। কুক, মেইড আর জন পাঁচেক ক্রু না নিয়ে এটা নাকি বের হয়না।

ফেরার পথে ড্রাইভ করল ন্যাট। ওরা দুইজনই থাইল্যান্ডের। ভালই ভদ্রতা জানে, আজ সারাদিনে তারা একবারো নিজেদের মধ্যে থাই ভাষায় কথা বলেনি। রোদে পুড়ে বিদ্ধস্থ অবস্থায় আমরা ফিরে আসলাম ভার্সিটিতে। এখন মনে হচ্ছে ভালই তো একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেল কিশোর-রবিন-মুসাদের মতন অথৈ সাগরে। কিন্তু পঞ্চাশটা স্যাম্পল নেয়ার কথা শুনে আমাদের মাথায় আজ যে আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল তা বোধকরি কখনই ভুলবোনা…

(মূল লেখাঃ সচলায়তন)

আমাদের প্রাইমারী স্কুলটা ছিল একটু ইসলামিক মাইন্ডেড। বাধ্যতামূলকভাবে কঠিন কঠিন আরবী শিখতে হত- বাংলা থেকে আরবীতে অনুবাদ টাইপ। যদিও তার অধিকাংশই এখন মনে নেই এবং প্রত্যক্ষভাবে পরবর্তীতে কাজে এসেছে কিনা বলতে পারবো না। মাঝে মাঝে আরব দেশগুলো থেকে আমাদের স্কুলে অতিথি আসতেন। তাঁরা আসার আগে আমাদের পি.টি. তে ট্রেনিং দেয়া হত- কিভাবে তাদের সাথে কথা বলতে হবে বা কী জিজ্ঞেস করলে কী উত্তর দিতে হবে এধরণের। আশ্চর্জজনকভাবে আমাদের কিছু শিক্ষকও দেখতাম চমৎকার আরবীতে কথা বলতে পারতেন! অতিথি আসার সিজন গুলোতে তাই তাদের কদর বেড়ে যেত অনেকখানি। পরে জেনেছিলাম স্কুল ঐসব আরবদেশ থেকে নিয়মিত ফান্ডিং পেত- তাইত তাদের আগমনকে উপলক্ষ্য করে এত আয়জন। উপরের কথাগুলো বললাম আমার লেখার বিষয়ের একটা ভূমিকা দিতে। লেখার বিষয় খুব সাধারণ- ক্লাসে টীচারের সাথে আমাদের সম্পর্ক বা দূরত্ব যেটাই বলি না কেন। স্কুলটার নিয়ম ছিল ক্লাসে টীচার আসা মাত্র সবাই দাঁড়িয়ে সালাম দিবে। মনে আছে একদিন মিজান স্যার ক্লাসে আসলেন। কেন যেন সালামের শব্দ খুব একটা জোরে হলনা। স্যার তো খেপে ফায়ার- ‘ঘটনা কি? সালাম শোনা গেলনা কেন?’ এই বলে সবাইকে নির্বিচারে বেত্রাঘাত। ক্লাসে ছিল আনুমানিক চল্লিশজন। ফার্স্ট বয় (আসলে ফার্স্ট গার্ল) থেকে শুরু করে সবাই মার খেল। প্রথম সারির স্টুডেন্টরা মার খেলে অন্যদের গুলো কিছুটা প্রশমিত হয়ে যায়, খুব একটা লজ্জাবোধ আর হয়না। তো সেই স্যার বললেন, ‘এইবার আমি আবার ক্লাসে ঢুকবো, তোরা আবার সালাম দিবি’। ভোকাল কর্ড ফাটিয়ে সবাই বলে উঠলো- আস্সালামু আলাইকুম। এত জোরে যে স্যার একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন, বুঝতে পারলেন না যে এটা কিছুটা ফান এর পর্যায়ে চলে গেল কিনা। পরবর্তী প্রতি ক্লাসেই মিজান স্যারকে এভাবে অভ্যর্থনা জানানো হত। এরপর হাইস্কুলে গেলাম। ওটা সরকারী স্কুল, ওখানে কেবল দাঁড়ালেই চলত। তারপরও কিছু স্যার সজাগ দৃষ্টি রাখতেন যে কেউ বসে রইল কিনা। তাকে কিভাবে শাস্তি দেয়া যায়, এসব করেই কেটে যেত আরও মিনিট দশেক। একটা ম্যাডামের কথা না বলে পারছি না- রুমি ম্যাডাম। উনার ক্লাসে সবাইকে রোবট হয়ে বসে থাকতে হত। কেউ কোন কাজে দাড়ালেও সোজা হয়ে ক্যাডেটদের মত দাড়াতে হত। ক্লাসের অর্ধেক সময়ই চলে এত উনার ক্লাসে কিভাবে থাকতে হবে তার উপর বয়ান দিয়ে। কলেজে ছিলেন মোজাম্মেল হক স্যার- উনি এই বয়সের ছেলেদেরকেও থাপ্পড় দিতেন। চট্টগ্রাম কলেজে উনি একটা আলোচনার টপিক! ভার্সিটিতে এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি খুব একটা মনে পড়ছে না। তারপরও ক্লাসে লেকচার না শুনে অন্যমনস্ক থাকলে কথা শুনতে দেখেছি অনেককেই। সবচেয়ে অবাক হয়েছি প্রবাসে পড়াশুনা করতে এসে ক্লাসরুমগুলো দেখে। এমনিতেই এখানে আমি নতুন, তার উপর এমন কড়া টাইপের স্কুল কলেজ পার হয়ে এসেছি। আমার সামনের মেয়েটা নিজের চেয়ারে বসেই ক্ষান্ত হয়নি, সামনের চেয়ারটা নিজের দিকে ঘোরালো। তারপর ঐটার উপর তুলে দিল তার পা! বামের চেয়ারটাও ঘোরালো, তার উপর রাখলো বই। আর নিজের চেয়ারে কেবল খাতা আর কলম। পাশে আরেকজন তার মোবাইল নিয়ে খুব ব্যস্ত, খুব সম্ভবত চ্যাট্ করছে। একদম শেষে একজন তার ল্যাপটপ বের করে ব্রাউজ করছে। কেউ কেউ খাচ্ছে, আশে পাশে ড্রিঙ্কস এর ছড়াছড়ি। ওদিকে টীচার তো পড়াচ্ছেনই। উনিও টীচার না- তাকে বলা হয় কোর্স ইন্সট্রাক্টর! হ্যাঁ, অনেকেই অবশ্য মনযোগ দিয়ে লেকচার শুনছে। ছাত্রদের মাঝেও কত রকমভেদ- কারো কারো বয়স নির্ঘাত চল্লিশ ছাড়িয়ে গেছে। দেশে এধরনের স্টুডেন্ট দেখে তো আমি আর অভ্যস্ত না, তাই মনে মনে ভাবি এই বয়সেও তাদের কত খানি তেল- ক্লাস করছে, ক্লাসনোট তুলছে, ক্লাস শেষে এক কোণায় বসে হোমওয়ার্ক সেরে নিচ্ছে।

আমি দেশে যে জাপানি প্রফেসরের সাথে প্রজেক্টে জড়িত ছিলাম, একবার তাকে আর তার স্টুডেন্টদের নিয়ে বেড়াতে গেলাম পদ্মার এক চড়ে। সাদা সাদা বালির মধ্যে কতগুলো মরা কেঁচো পড়েছিল। প্রফেসর তার এক ছাত্রীকে কি প্রসঙ্গে যেন বলছিল যে এই কেঁচোগুলা সে খেতে পছন্দ করে! ছাত্রী মুখ বিকৃত করে ইয়াক্ করে উঠল। প্রফেসর মজা করে একটা কেঁচো হাতে নিয়ে ওই ছাত্রীর দিকে ছুড়ে মারলো। অমনি সে দিল দৌড় আর চিৎকার করে বলতে লাগলো- ‘আই হেইট ইয়ূ, আই হেইট ইয়ূ…’

চিন্তা করে দেখলাম, ওরা যে শিক্ষককে সম্মান করেনা তা না। সেটা অন্যভাবে করে। ভিন্ন কালচারে বড় হওয়ার কারণে আমাদের কাছে সেটা হয়ত কখনই বোধগম্য হবে না…

বেশ কিছুদিন আগের কথা। বাসে করে ঢাকা থেকে হোমনা যাচ্ছি। সামনের দিকে জায়গা পাইনি, বসেছি একেবারে পেছনে। আমার হাতে একটা বই-ড্যান ব্রাউনের দ্যা দা ভিঞ্চি কোডকিছুক্ষণ পরই বুঝতে পারলাম জার্নিতে এত কঠিন একটা বই আনা উচিত হয়নি; প্রয়োজন ছিল হুমায়ুন আহ্‌মেদীয় সহজ কোন বই। যা পড়ে একটু পর পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকানো যাবে, কিংবা কিছুক্ষণ কোন যাত্রীকে পর্যবেক্ষণ করে আবার বইয়ে ঢুকে যাওয়া যাবে। বাসে বেশিরভাগ লোকই ব্যবসায়ী শ্রেণীর। তাদের উচ্চস্বরের সাধারণ কথাগুলোই আমার কানে ঢুকছে ঝগড়া হয়ে। বিরক্তিকর। আমি আগেও খেয়াল করেছি, এদের কথাবার্তার সাধারণ বিষয় একটাই- টাকা। তো নানাবিধ কারণে বিরক্তি চরম আকার ধারণ করার আগেই বাসটা হঠাৎ মাঝরাস্তায় সরিষা ক্ষেতের পাশে দাড়িয়ে গেল। দেখলাম দুজন লোক বাসে উঠছে। উঠেই তাদের একজন বাস ড্রাইভারকে হাত মুঠো করে কী যেন দিল, তারপর দুজনেই আমার পাশে এসে বসে পড়ল।

প্রথম থেকেই চেনা চেনা লাগছিল। ভাল করে দেখার পর নিশ্চিত হলাম- আরে হকসাব আর মজিদ সাব না! আমার সম্বোধন শুনে তারা দুজনই সাংঘাতিকভাবে চমকে উঠল- কি কইলেন ? আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম- শুনেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি আপনাদের গ্রামেরই লোক। কালেভদ্রে গ্রামে যাইতো, তাই চিনেন না। এখন তো শুনেছি আপনারা ও গ্রামে যান না… আমার বাড়ি দাড়িগাঁও শুনে তাদের মন খারাপ হয়ে গেল, হক আস্তে করে বলল- আপনে আমাগো সাব কইয়া ডাকলেন?

আমি জানালা দিয়ে বাইরে সরিষা ক্ষেতের দিকে তাকালাম। তীব্র হলুদ বলে অনেকক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে এক ধরনের ভ্রম হয়। সেই দৃষ্টিবিভ্রমের মাঝে আমি হারিয়ে গেলাম অতীতে। খুবই নিকট অতীত।

*** *** ***

হতদরিদ্র বাবা শখ করে নাম রেখেছিলেন- হকসাব আর মজিদ সাব। আগে পিছে আর কিছু নাই। শহরাঞ্চলে মূলনামের সাথে এভাবে সাহেব যুক্তকরণ সাধারণত দেখা যায় না। তবে নাম রাখলে কী হবে, গ্রামের মানুষ মাষ্টার, চেয়ারম্যান বা জমিদার ছাড়া অন্য কাউকে সাব ডাকতে নারাজ । তাই হক আর মজিদের নামের বিকৃতি ফরজ হয়ে গেল- হক থেকে হইক্যা আর মজিদ তেকে মইজ্যা । মাঝে মাঝেই আমি শংকিত হই, নিয়মিত গ্রামে থাকলে আমার নাম বিকৃত হয়ে না জানি কী হত! এক গ্রামবাসীকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- ভাই আপনারা যে লোকটাকে হইক্যা বলে ডাকেন, তার আসল নাম কী ?

-হের আসল নাম হইল হক সাব

-তাহলে হইক্যা ডাকেন কেন ?

-হেই বান্দীর পুতেরে আবার সাব ডাকবো কেডা? এহ্‌…

হক আর মজিদের বয়সের পার্থক্য মাত্র এক বছর। মজিদের জন্মের সময়ই মা মারা যায়, আর তার পাঁচ বছর পর বাবাও মারা যায়। কৈশোর থেকেই তাদের আয়ের একমাত্র উৎস হল ফুটবলহ্যাঁ এটাই তাদের একমাত্র গুণ। তাই আশেপাশের সব গ্রামেই তারা পরিচিত। শোনা যায় তারা নাকি ঢাকায় কোন বড় ক্লাবেও আমন্ত্রণ পেয়েছিল; কিন্তু গ্রামের মায়া ত্যাগ করে যেতে পারেনি। তাছাড়া গ্রামের যুব সম্প্রদায়ের কাছেও তারা বেশ জনপ্রিয়। তাদের সম্পর্কে সবচেয়ে মজার তথ্য হল-কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল মাঠ না হলে তারা খেলতে পারে না। কেউ কেউ মজা করে বলে- শুগ্‌না মাঠে আমার বুজি (দাদী) ও হেরার থেইক্যা ভাল খেলবো আবার আরেকজন বলে- বৈদেশের মাটিতে খালি প্যাক্‌ বানাইয়া ওগোরে নামাইয়া দেও, রুনালদো-ম্যারোডোনারও ক্ষ্যাম্‌তা নাই যে থামাইবো…

দুই ভাইকে নিয়ে এসব আলোচনা, সমালোচনা, প্রশংসা চুড়ান্তরূপ ধারণ করত প্রতি বর্ষায়। স্কুলমাঠে আয়োজিত হয় ফুটবল টুর্নামেন্ট যা একটু ব্যাতিক্রমধর্মী- বিবাহিত বনাম অবিবাহিত। অর্থাৎ গ্রামের পুরুষদের মাঝে বিয়ের ভিত্তিতে দুটি ভাগ। পুরষ্কার দেয়া হয় বড় সাইজের একটি গরু। তবে এক্ষেত্রে সম্মানটা বিরাট বড় ব্যাপার, কারণ খেলার দিন সারা গ্রামের ছেলে-বুড়ো, যুবক-যুবতী, মহিলা সবাই বেশ আগ্রহভরে হাজির হয়। হক আর মজিদের কৃতিত্বে গত কয়েক বছর ধরেই অবিবাহিতরা চ্যাম্পিয়ন।

অনেক সময় দেখা যায় বাপ-ছেলে একই খেলায় উপস্থিত। একবার বাপ বল নিয়ে আক্রমন করছে, ডিফেন্ডার ছেলের কর্তব্য তাকে ঠেকানো, ছেলে নিজে কিভাবে যাবে? তার কেমন যেন লজ্জা লাগছে, পাশের ডিফেন্ডারকে বলল- এই তুই যা, গিয়া আব্বারে ঠেগ্‌ দে… এমন হাজারো ছোটখাটো হাস্যকর ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রতিবছর টুর্নামেন্ট চলে। হয়ত এটি খুবই সাধারণ একটা খেলা; কিন্তু গ্রামবাসীর কাছে এটি খেলার চেয়েও বেশি কিছুকারণ সারাবছর ধরেই জয়ী দল আর বিজিত দলের মধ্যে কথার মারপ্যাঁচ চলতে থাকে। আর বিশাল অংকের টাকার বাজি তো আছেই।

*** *** ***

সেবার প্রথম খেলায় অবিবাহিত দল সহজ জয় পায়। হক আর মজিদের খেলার প্রশংসা সকলের মুখে মুখে। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে হঠাৎ কী যেন হল, দুই ভাইয়ের কেউই খেললনা। বিবাহিত দলের হয়ে খেলা জিলানী কাকা মাঠে এসে বললেন যে ওরা দুজনেই অসুস্থ, আজ আসবে না। সবাই অবাক! তাদের ছাড়াই খেলা শুরু হয়ে গেল আর ফলাফলও যা হওয়ার তাই হল। হঠাৎ পরিবর্তনে অবিবাহিত দল হেরে গেল। জিলানী কাকার মুখে তেলতেলে হাসি। পরবর্তী শুক্রবার ফাইনাল ম্যাচ। গ্রামের মানুষ তখনো জানে না কী হতে চলেছে…

*** *** ***

জিলানী কাকার বাসায় হক ও মজিদ এসেছে। তাদের চোখেমুখে উৎকন্ঠার ছাপ স্পষ্টকাকা বললেন- শোন বাবারা, আইজ হোক কাইল হোক তোমরা তো বিয়া করবাই। তখন তো আমাগো দলেই খেলবা, নাকি?

-কিন্তু আমরা তো একটা ম্যাচ হেই দলে খেইল্লা ফালাইছি, এখন আবার…

মজিদ ক্ষীণ স্বরে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে।

-এইডা কুনু বিষয়ই না, আমরা তো বেআইনী কিছু করতাছি না। আইজ রাইতেই তুমরা বিয়া করবা। আমাগো দলের খেলুয়ার রহমতের দুই মাইয়ারে।

হক আর মজিদ একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। হক বলল- কিন্তু মেম্বার সাব তো আবিয়াইত্যা (অবিবাহিত) দলের উপরে এক লক্ষ ট্যাকা বাজি ধরছে, আমরা দল পাল্টাইলে যদি কুনু ক্ষতি করে… জিলানী কাকা রাগত স্বরে বললেন- ওই মেম্বার হালার লগে একবার ইলেকশানে হারছি, আর না। এবার ওরে বাজিতে হারামুই। শোনো তোমাগো বিয়ার যৌতুক নগদ পঞ্চাশ হাজার ট্যাকা। আর কুনু কতা না। আইজই বিয়া।

*** *** ***

শুক্রবার, বাদ জুম্মাস্কুলমাঠে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে, তিলধারনের জায়গা নেই। বাজারে আজ বেশি করে মাল তোলা হয়েছে, লোক সমাগমের দরুন কেনাকাটা বেশি হবে। ইতিমধ্যে সবাই হক আর মজিদের বিয়ের খবর জেনে গেছে। তাদের মধ্যে চাপা একটা গুঞ্জন। ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে হাস্যকর আর ছেলেমানুষী। কিন্তু গ্রাম্য পলিটিক্স অতটা সহজ না। স্বার্থে আঘাত আসলে এখানে মানুষ যে কোন কিছু করতে পারে। সেটা হোক অস্তিত্বের স্বার্থ কিংবা মান সম্মানের স্বার্থ।

*** *** ***

বাস আরেকটা ষ্টেশনে থামলো। আমি মজিদকে বললাম,

-কত বছর আগে গ্রাম ছেড়েছেন?

-তিন বছর। আর যামুনা ওইখানে, সব বদলোক…

মজিদের এই অভিমানের কারণ আমি জানি। দল পরিবর্তন করায় গ্রামের যুবকরা তাদের দুইজনের উপর সাংঘাতিক ক্ষেপে যায়। পরাজয়ের জন্য তাদেরকেই দায়ী করা হয়। তারপরের ঘটনা আরও বেদনাদায়ক। ষড়যন্ত্র করে তাদের দুভাইকে চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। মেম্বারের কারসাজিতে তারা হয় গ্রামছাড়া। জিলানী কাকাও সুবিধামত সটকে পড়েন।

চুরি না করেও চোর সাজতে হল। অর্থোপার্জনের জন্য শেষে দুই ভাই চুরি করাই শুরু করল। শেষ যেবার আমি গ্রামে গিয়েছি তখন শুনেছি যে তারা নাকি প্রতিষ্ঠিত চোর। বউ নিয়ে অন্য গ্রামে থাকে, তবে এক গ্রামে বেশি দিন নয়।

কিন্তু এখন তারা কী করে? আমি আবার তাদের ভালো করে দেখলাম। বেশভূষায় বেশ পরিবর্তনের ছাপ। শার্ট-প্যান্ট, পায়ে সু, চোখে সানগ্লাস, মুখে চুইংগাম আছে মনে হয়- একটু পর পর মুখ নড়ছে। আমি বললাম- আপনারা আর ফুটবল খেলেন না?

মজিদ বলল- নাহ্‌।

হক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল- ফুটবল খেইলা কী হইবো? ফুটবল কি আমাগো ভাত দিব?

আমি বললাম- তো এখন কী করা হয়?

মজিদ বলল- ভাইজান আমরা ভালা হইয়া গেছি, এখন আর চুরি-চামারী করিনা। বেলেক এর বিজনেস ধরছি।

ব্ল্যাকের বিজনেস কথাটা মজিদ এমন ভাবে বলল যেন এটা মহৎ কোন কাজ! হক উৎসাহের সঙ্গে বলল- ডলার, ইউরো ভাঙ্গাইতে চাইলে বা বিদেশী মোবাইল, সিডি, টিভি লাগলে কইয়েন। ইন্ডিয়া থেইক্যা চালান আসে। জানেন তো আমরার কুমিল্লার এদিক দিয়া এইসবের বন্দোবস্ত মাশাল্লাহ্‌

আমি তাদের বড় ব্যাগটি দেখিয়ে বললাম- ব্যাগে কী ? এইসব জিনিস?

- জ্বে না ভাইজান, এইগুলান ফেনসিডিল। বাংলা ও আছে- চাইর নাম্বার থেইক্যা এক নাম্বার পর্যন্ত…

আমি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে তাকালাম। গ্রামের সহজ সরল ছেলেগুলো এখন কোন পর্যায়ে অপরাধী হয়ে গিয়েছে। অথচ তাদের চোখেমুখে বেশ তৃপ্তির ছাপ, ব্যস্ততা তারা উপভোগ করছে। আমি ভাবি, শত ব্যস্ততা শেষে রাতে ঘুমোতে যাবার সময় একবারও কি তাদের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়না? একবারও তাদের প্রিয় গ্রামখানির কথা মনে পড়ে না? যে গ্রাম ছেড়ে একদিন তারা শহরের বড় ক্লাবে আসতে রাজী হয়নি।

—————————————————————–

বিঃ দ্রঃ এই গল্পটা ২০০৬ সালে ব�
�শ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন লেখা…

ঠিক একবছর আগের নববর্ষে আমি বাংলায় ব্লগ লেখা শুরু করেছিলাম। তার আগ পর্যন্ত কেউ বাংলায় কিছু লিখলে আমি পড়তে পারতাম না। লেখাটাও খুব বিরক্তিকর মনে হত। ইরতি ভাই অনেকটা ধরে বেঁধে আমাকে বাংলায় লিখতে বাধ্য করলেন। এরপর থেকে বাংলায় ব্লগ লিখে নিজের কাছে এত ভাল লাগত যে মনিটরে হাত দিয়ে তা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করত। পরে আমারও একটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল নেটে বা সামনে বসে অন্যান্য বন্ধুদের বাংলা টাইপিং শেখানো…এই যেমন সেদিন আমার থিসিস সুপারভাইজার ডঃ ফারুক আহমেদ কে বাংলা টাইপিং শিখিয়ে খুশি করে দিলাম!

এবারের নববর্ষের দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম মজার একটি দিন। অর্জুন প্ল্যান করেছিল ভোর পাঁচটায় রমনার বটমূলে যাওয়ার। কিন্তু এবারও আমি রাত করে ঘুমোতে যাওয়ার দরুন এত সকালে উঠতে পারিনি। আমাকে ছাড়াই তাই ওরা চলে যায়। অর্জুন তো আমার উপর মহা ক্ষেপে গিয়েছিল! যাই হোক সকাল দশটা নাগাদ ক্যাফেটেরিয়ার সামনে আমি তাদের সাথে মিলিত হই। ততক্ষনে আবার ওদের মাঝে ক্লান্তি ভর করেছে। কিছুতেই আবার ওদের চারুকলার দিকে নিতে পারলাম না। অগত্যা বুয়েটেই কিছুক্ষন ঘোরাফেরা করে আমি রওনা হলাম খালামণির বাসায়। ওখানে আমাদের সব আত্মীয়-স্বজন একসাথে হয়েছে। উদ্দেশ্য খালাত ভাইয়ের বিয়ে। আমি আগেই ওদের বার বার বলেছি নববর্ষের দিন বিয়ের তারিখ না ফেলতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তার উপর তারা চট্টগ্রাম থেকে এসেছে বলে বছরের এই দিনটিতে ঢাকার অবস্থা কী হয় সে সম্পর্কে বাস্তব কোন ধারণা ছিলনা। ভাগ্য ভাল সেদিন কেন যেন বকশী বাজার থেকে শান্তিনগরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা ছিল। ব্যাপারটা আমি বুঝলাম না। গত বছরও তো আমি আর জিতু যখন সেগুনবাগিচার দিকে যাচ্ছিলাম তখন জনসমুদ্রের জন্য হাঁটতে পারিনি! এবার কি তবে মানুষ কম বের হয়েছে। কে যেন বলল এবার মানুষের পকেটে টাকা নেই; তাই তাল কমে গিয়েছে…

নববর্ষের দিন বাবা-মা, ভাই-বোনের সাথে কাটানো-টা আমার কাছে স্বপ্নের মত লেগেছে। কাজিনের বিয়েই আমাদের এই সুযোগ করে দিয়েছে। বিয়ের উৎসব শেষে আমি সবাইকে নিয়ে রাতে চলে আসি আর্কিটেকচারের বর্ষ বরণ অনুষ্ঠানে। নিঃসন্দেহে অন্য যেকোন বারের চেয়ে তাদের এবারের অনুষ্ঠান অনেক ভাল হয়েছে। আব্বু, আম্মু, খালামণি বাউল গানের পরিবেশনাটা খুব উপভোগ করেছে। বিশেষ করে ঢাকা পদাতিকের নাটকে যখন যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস বিকৃতি প্রভৃতি উঠে আসে তখন আব্বু বেশ উৎফুল্ল হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে বুয়েটেও রাজাকার-বিরোধী শক্তিশালী একটা অংশ সোচ্চার আছে? আমি তখন বাবাকে জানাই যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব একটা সক্রিয় না হলেও এই একটা বিষয়ে চরম উত্তেজিত। কোথাও জামাত-শিবির-রাজাকার এর গন্ধ পেলেই তার বিরুদ্ধে সমবেত হয়ে পড়ে।

তো নাটক, বাউল গান সেদিন পরিবেশের সাথে খুব মিলে গিয়েছিল। এগুলো শেষে আমি বাবা-মা, খালামণিকে বাসায় পাঠিয়ে দেই। আর আমি, পিয়াস, পল্লব, বাছির, সোহেল ভাই থেকে যাই একটা জিনিসের জন্য শিরোনামহীন। আমার শিরোনামহীন কে নিয়ে লেখা পূর্বের ব্লগ যারা পরেছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে আমি তাদের খুব বড় রকমের ভক্ত। এবার অনেকদিন পর তাদের কনসার্ট উপভোগ করার সুযোগ পেলাম। সবচেয়ে বড় কথা আমার, বাছিরের কিংবা আমার ছোট ভাইদের সবারই শিরোনামহীনের প্রায় প্রতিটি গানই মুখস্থ। তাই গানগুলো আমরা সবাই অনুভব করছিলাম।

তুহীন ভাইকে ধন্যবাদ, আমাদের নববর্ষের দিনটির সমাপ্তি এত সুন্দর হল বলে। বন্ধুদের মাঝে যারা এটা মিস করেছে তাদেরকে আমি বলব- দুর্ভাগা!

কনসার্ট শেষেও আরেকটা জিনিস বাকি ছিল সোডিয়াম আলোতে হন্টন। রাত বারোটায় আমরা সবাই আজকের সারাদিনের কর্মকান্ডগুলি নিয়ে টুকরো টুকরো গল্প করতে করতে রওনা দিলাম খালামণির বাসার দিকে। ওখানে বাবা-মা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আর হ্যাঁ সেদিন রাস্তায় ছিল অনেক বাতাস। ঠান্ডা বাতাস।

বিঃদ্রঃ বাছির সারাদিনের প্রায় দুশ ছবি তুলেছে! আমার ফেইসবুক প্রোফাইলে বেশ কিছু ছবি সবার সাথে শেয়ার করলাম…

আজ অনেকদিন পর ব্লগ লিখতে বসলাম। আসলে এখন অনেকদিন পরপর-ই বসি। দিনগুলো কেটে যাচ্ছে অসম্ভব ব্যস্ততায়। আগে যেখানে দুই দিন বন্ধ পেলে সেটাকে অবসর বলতাম, এখন দুই ঘন্টা ফ্রি সময় পেলে খুশি হয়ে যাই – বাহ! এখন তো আমার কোন কাজ নেই, মুভি দেখা যাক…

একটু আগে আসলাম বুয়েটের অডিটোরিয়াম থেকে। ওখানে চট্টগ্রাম সমিতির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। এবার আমি কোন কাজই করিনি। যে ম্যাগাজিনে আমার থাকার কথা ছিল; সেই দায়িত্ব সামি ভালভাবেই সামলিয়েছে। আমি আসলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের ম্যাগাজিন সৃষ্টি নিয়ে গত দুই সপ্তাহে এতই ব্যস্ত ছিলাম তার ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এবার সাথে জুনিয়র দুইজন রাকিব ও তানভীর ছিল। কিন্তু তবু আমার আর রাফির মাঝে একটা ব্যাপার কাজ করেছে- হয়ত ওদের হাতে এটা ছেড়ে দিলে ঠিকমত করতে পারবে না বা ওইটা ভুল করবে। তাই সবকিছু আবারো আমাদের দুইজনের উপর দিয়েই গেল। যেহেতু ম্যাগাজিনের কাজ ধরলে আমি একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাই, তাই এবার ইচ্ছে করেই চট্টগ্রাম সমিতির ম্যাগাজিন সাম্পান-এ জড়াই নি। ভাগ্যিস সামি আমার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে, তাই সে নিজেই পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তারপরও আমি তার কাছে লজ্জিত- আমার হয়ত তাকে আরও বেশি সাহায্য করা উচিৎ ছিল…

এবার সৃষ্টি-তে ফিরে আসি। বেশ ভাল লাগছে যে সিভিল ডিপার্টমেন্টে আমরা একটা ধারার সূচনা করতে পেরেছি। আমি মুখচ্ছবি আঁকি আজ থেকে দশ বছর কিংবা তারও পরে সিভিলের ছাত্ররা একটা ফেস্টিভ্যাল করবে, সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে তারা একটা ম্যাগাজিন বের করবে যাতে লেখা থাকবে সৃষ্টির ১০ম প্রকাশনা…সেই ম্যাগাজিনটাও হয়ত শুরু হবে জীবনানন্দের কোন কবিতা দিয়ে। সেখানেও হয়ত ডিপার্টমেন্টের কোন একজন প্রফেসারের সাক্ষাৎকার থাকবে যেটা সারারাত ধরে কানে হেডফোন লাগিয়ে বসে বসে লিখবে আমারই মত কোন ছাত্র। আমি মুখচ্ছবি আঁকি।

এবার কাজ করতে গিয়ে অনেকের ভালবাসা পেয়েছি – অনেক জুনিয়র, ব্যাচমেটসহ টিচারদের পর্যন্ত। মফিজ স্যার, অনুপ স্যার, হাদি স্যার, মুনাজ স্যার প্রতিদিনই ফোনে খবর নিতেন কোন সমস্যা হচ্ছে কী না। আমরা এবার সঠিক সময়েই ম্যাগাজিন বের করতে পেরেছি। মানে অনুষ্ঠানের দিনই হাতে পেয়েছি। এবারও অনেক অভিজ্ঞতা হল, অনেক মজার মজার ঘটনা। তবে এ ব্যাপারে আর ব্লগ লেখা আমার মনে হয় ঠিক হবে না। আগের সাত পর্বের ধারাবাহিক পড়ে অনেকেই হয়ত বিরক্ত…তবে একটা ঘটনা দিয়ে ব্লগটা শেষ করি যা আমাকে স্পর্শ করেছে। অনুষ্ঠানের দিন সন্ধ্যায় আমাকে সিহাব ফোন করলো, এই রিজভী, তোকে মুনাজ স্যার খুঁজছে। গেলাম স্যারের কাছে। স্যার তখন সফটওয়্যার প্রদর্শনী থেকে মাত্র বেরুলেন। আমাকে দেখে বাড়িয়ে দিলেন তাঁর হাতের খাবারের প্যাকেটটি। আমি অবাক, না স্যার, ঠিক আছে, আপনি খান। স্যার জোর করে আমার হাতে গছিয়ে দিয়ে বললেন, আরে খাও না। আর ম্যাগাজিন খুব ভালো হয়েছে…প্রচ্ছদটাও আমার ভালো লেগেছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, স্যার নিজেও এবার আমাদের ম্যাগাজিনের একজন প্রুফ রীডার ছিলেন। কারণ স্যার ছাত্রাবস্থায় নাকি প্রায় দশ বছর প্রকাশনার সাথে যুক্ত ছিলেন…

আমি মন খারাপ থাকলেই হয়ত ব্লগ লিখি। কারণ আজ যখন চট্টগ্রাম সমিতির অনুষ্ঠানে অডিটোরিয়ামে বসে ছিলাম তখন আমার সাত দিন আগের সিভিল ফেস্টিভ্যালের অনুভূতিটা ফিরে এল এটাই আমাদের বুয়েটে শেষ বছর। সবকিছুরই শেষ।

আজ দ্বিতীয় বারের মত বইমেলা থেকে ঘুরে এলাম। কাল একুশে ফেব্রুয়ারী বলে আজ প্রচন্ড ভীড় হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু দুপুরের দিকে টিপটিপ বৃষ্টি মনে হয় অনেকের প্ল্যান ভেস্তে দিয়েছে। হঠাৎ আজ সকালেই আমার কাজিন বাছিরের ফোন রিজভী চল আজ বইমেলায় যাই। পরে তো আর সময় পাবো না। বাছির মেডিক্যালে পড়ে, গত দেড় মাস ধরে ওর প্রফ চলছে। একটা পরীক্ষা দিয়ে ও বড়জোর একদিন ছুটি পায়! তাই আমি বললাম চল। আর মাহদীকেও ফোন কর। আমি তারেককে বলছি।

চট্টগ্রাম কলেজে যখন পড়তাম, তখন আমরা চারজন একসাথেই থাকতাম। এক বেঞ্চে বসতাম, ক্যাম্পাসেও একসাথে ঘোরাঘুরি করতাম। আজ অনেক বছর পর চারজন একসাথে হওয়ার একটা সুযোগ মিললো। তারেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজিতে, মাহদী একই বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আর বাছির স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যালে পড়ে। সবাই আমরা ঢাকাতে থাকার পরও বাছির ছাড়া অন্য দুজনের সাথে আমার দেখাই হয়না। সবাই এত ব্যস্ত!

মাহদী আসতে পারলোনা। আসলে ওকে আমাদের আরো আগে বলে রাখা দরকার ছিল। হঠাৎ ফোন পেয়ে সে সময় বের করতে পারেনি।

যাই হোক আমরা তিনজনই বইমেলা প্রাঙ্গনে ঘুরে বেড়ালাম। বৃষ্টির কারণে সর্বত্র কাদা। বারবার হাটার সময় ভয় করছিল এই বুঝি আছাড় খাই। আমি আবার হাটার সময় নিচের দিকে তাকাই না…

এবার আমার পরিচিত দুইজনের বই বেড়িয়েছে। প্রথমটা আমার মামী আমেনা সফিকের হৃদয়ে চন্দ্র দহন। দ্বিতীয়টা ৩৬০ তে আমাদের সবার প্রিয় পল্লব দাদার স্বপ্নপাখি। মামীরটা তো উপহারই পেয়েছি। তাই আজ প্রথম যে বইটা কিনলাম সেটা হল স্বপ্নপাখি। দুটোই কবিতার বই। কবিতা সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত। তাই আর এ বইগুলোর কবিতা নিয়ে কিছু লিখতে পারছিনা। তবে নিজেদের মাঝে কেউ একজন বই বের করেছে, এটা ভেবেই আমি পুলকিত। এমনিতে দাদার লেখার বড় রকমের ফ্যান আমি। বোধ করি ৩৬০র অনেকেই…

প্রাঙ্গনে আহসান হাবীব দাড়িয়েছিলেন, একা! দেখতে একদম হুমায়ূন আহমেদের মত। তারেক বললো উনার অটোগ্রাফ নিবি? আমি বললাম, কিন্তু তার তো কোন বই কিনিনি। শুধু তাঁর প্রকাশিত উম্মাদ পড়ি প্রতিমাসে। তারেক বললো অন্য যেকোন বইয়ে উনি অটোগ্রাফ দেন। আর তার পাশে নিজ থেকেই একটা কার্টুন এঁকে দেন। শুনে আমার উৎসাহ জাগলো। সালাম দিয়ে বাড়িয়ে দিলাম দাদার লেখা বইটার প্রথমের সাদা পে
জটা (দাদা কিছু মনে কোরো না)। আহসান
হাবীব হাসিমুখে আমার নাম জিজ্ঞেস করে, অটোগ্রাফ দিলেন। পাশে খুব দ্রুত একটা কার্টুন এঁকে ফেললেন!

অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে এত ভীড় যে ওটার আশেপাশের স্টলেও যাওয়া যায়না। এই স্টল দেখে গতবারের বইমেলার একটা হাসির ঘটনা মনে পড়লো। ঘটনাটা বাছিরের মেডিক্যালের দুই বন্ধুকে নিয়ে। তারা নাকি এই স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছিলো। তার আগের দিন দেখে গেছে ইমদাদুল হক মিলনের একটা নতুন বই বেড়িয়েছে। সেদিন গিয়ে দেখে একদিনের ব্যবধানে আরেকটা বই চলে এসেছে। এমনিতেই আমাদের বয়সের পাঠকদের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা নেই বললেই চলে। তখন একজন আরেকজনকে বইটা দেখিয়ে বলছে এই দ্যাখ্ ! মিলন পাগলা তো আরেকটা বই লেইখ্যা ফেলছে! বলার পরপরই তাকিয়ে দেখে ইমদাদুল হক মিলন তাকিয়ে আছে। এই স্টলেই এতক্ষন বসে ছিল!!! ঘটনাটা চাক্ষুস দেখিনি। শুনেই আমার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে…

বিঃ দ্রঃ ছবিতে আহসান হাবীবের পাশে তারেক।

« Previous PageNext Page »

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.