নতুন একটা ভাবের উদয় হয়েছে! আমি আমার সেলফোন গত এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ করে রেখেছি । কয়েকদিন মুঠোফোন ছাড়া চলে দেখি কেমন লাগে! অবশ্য এই বাসনাটা আমার প্রায়ই জাগে, কিন্তু নানা ঝামেলায় হয়ে ওঠেনা।

হাসি যেমন সংক্রামক, তেমন পাগলামি ব্যাপারটাও মনে হয় কিছুটা সংক্রামক। ঘটনাটা খুলে বলা যাক। রাফি কয়েকদিন আগে বাসে করে হল-এ আসছিলো। বাংলামটর পর্যন্ত এসে নাকি তার খেয়াল হল আরি! আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি না কেন? বাসে কেন বসে আছি? যেই কথা সেই কাজ। বাস থেকে নেমে ও পায়ে হেটে বাকী পথ আসলো।হেটে আসার পথে নাকি সে খুব আনন্দ পেয়েছে, গোটা দুয়েক আইসক্রিম ও সাবাড় করেছে। কিন্ত হল-এ পৌঁছে তার খেয়াল হল, সে কোনো কারণ ছাড়াই এই কাজটা করেছে। এবং ইচ্ছাকৃত যে তাও কিন্তু না!

আমাদের যখন যা ইচ্ছে করে তা করতে পারলে ভাল হত। কিন্তু নানাবিধ বিধি-নিষেধ এর বেড়াজালে পরে তা করতে পারি না। একটা গানের কথা আমার খুব ভালো লাগে – এমন মানব জনম আর কী হবে… মন যা করে ত্বরায় কর এ ভবে …

এবার আমার এই ব্লগের শিরোনাম, মানে হিমু প্রসঙ্গে আসি। মোবাইলের ব্যাপারে হিমুদর্শন খুব সুন্দর হিমুরা যোগাযোগের যন্ত্র পকেটে নিয়ে ঘোরে না। তারা বিশ্বাস করে যোগাযোগ যখন হবে, আপনাতেই হবে।

গল্প উপন্যাস এ আমি যত চরিত্র পেয়েছি তার মাঝে এই চরিত্রটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। অন্য অনেক হিমু ভক্তের মত আমারও প্রায়ই হিমু হতে ইচ্ছে করে। কিন্ত সেটা সম্ভব না। কারণটা মনে হয় কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। তবে আমার সাময়িকভাবে ফোন ত্যাগ করার ঘটনাটা হিমুর প্রভাব কিংবা বাহুল্য বর্জন নয়। কয়েক বছর আগে ফোন ছাড়া মানুষ কিভাবে চলত তাই দেখার ইচ্ছা।তাছাড়া মোবাইল থাকলে সারাক্ষন কেউ একজন অনুসরণ করছে বলে মনে হয়। যারা গত কয়েক বছর ধরে মোবাইল ব্যবহার করছেন তারা টেস্ট করে দেখতে পারেন মোবাইল ছাড়া রাস্তায় হাটলে সাংঘাতিক নির্ভার মনে হয়। নিজেকে স্বাধীন স্বাধীন লাগে!

ভাবতেই অবাক লাগে, আগে কারো সাথে যদি বুধবার বিকেল ৫ টায় দেখা করার কথা থাকত তবে ঠিক টাইমে যাওয়া ছাড়া কোনো গতি ছিলনা। আর এখন বের হওয়ার আধ ঘন্টা আগে কল করে নেই – দোস্তো, আমি বাসা থেকে বের হচ্ছি। তুই কই?

আমার এই ঘটনায় সবাই আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র একবার নাকি নিজেকে হিমু ঘোষণা করেছিল! রাত-বিরেতে পকেট ছাড়া হলুদ পাঞ্জাবী পরে খালি পায়ে হল-এ কিংবা সংলগ্ন রাস্তায় হাটাহাটি করত। তো আপরাপর ছাত্রগণ তাহার এহেন হিমুভাব দেখিয়া তাহাকে উপর্যুপরি উত্তমমধ্যম দিল। এই ঘটনার পর সেই হিমুরুপী ছাত্রটি সিধা হইয়া গেল (দুঃখিত হঠাৎ সাধু ভাষা ব্যবহারের জন্য, গুরুচন্ডালী হয়ে গেল!)। অবশ্য আমি ঘটনা extreme পর্যায়ে যাওয়ার আগেই আবার মোবাইল ব্যবহার শুরু করব । অন্তত উপরোক্ত ছাত্রের মত মার খেতে চাই না !

আমার এই ব্লগ পরতে পরতে অনেকেরই হয়ত হুমায়ূন আহমেদের নাম মনে পরবে। অনেকে হয়ত তাকে গালি ও দিয়ে বসবেন। আশেপাশের অনেকের মুখেই আমি
ুমায়ূন আহমেদের প্রতি ধিক্কার শুনি। কিন্তু আমার কথা হল, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তো আমাদের এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। তিনি তো বাংলা সংস্কৃতিতে কম অবদান রাখেননি। বাকের ভাই, হিমু, মিসির আলির মত আসাধারণ কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। আমি যখন হুমায়ূন আহমেদ বিরোধীদের এ কথা বলি, তখন তারা বলে – ‘একজন লেখকের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সে যদি ন্যাক্কারজনক উদাহরণ সৃষ্টি করে, তবে জাতি কার কাছে যাবে?’ আমার যুক্তি হল, আমরা বাঙ্গালীরা যদি এতই বুদ্ধিজীবিদের দেখে শিখতে চাই তবে একজনের negative side গুলো peak করার দরকার কি? কেন আমরা তারই ভাই জাফর ইকবাল স্যারের পত্রিকায় লেখা কলামগুলো পরি না? তার মতাদর্শ সমর্থন করিনা? জোর গলায় তার প্রশংসা করি না?

এতে কোনো সন্দেহই নেই যে হুমায়ূন আহমেদের বর্তমান বই বা নাটক গুলো কোনভাবেই তার মেধা বা শিল্প প্রতিভাকে প্রকাশ করে না। কিন্তু অতীতে যা করেছেন তাই বা কম কী ? একজন মানুষের সবকিছু তো আর A+ হয় না …

শেষ করি আবার হিমু প্রসংগ টেনে। কলকাতায় একবার এক বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ গিয়েছিলেন। তখন হলুদ পাঞ্জাবী পরা এক তরুণ নাকি তাকে এসে প্রণাম করে বললো –
“ এই যে দাদা, আমি হিমু সেজেছি ”
হুমায়ূন আহমেদ বললেন –
“ কই দেখি, পা খালি কিনা?”
তখন ছেলেটি হাসিমুখে তার খালি পা দেখায় …

Advertisements