ইদানিং একটা গান সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে শিরোনামহীনের পাখি গানটা। এ ব্যাপারটা মনে হয় সবারই হয়। কোনো একটা বিশেষ গানের, কোনো একটা বিশেষ অংশ মাথা থেকে আর বের হতে চায়না।

পাখি গানটা শিরোনামহীনের ইচ্ছে ঘুড়ি অ্যালবামের। প্রায় একবছর হয়ে গেল অ্যালবামটি বের হওয়ার, বেশ ভালই চলেছে। অন্তত তরুনরা পছন্দ করছে। ভাবতে ভাল লাগে, যে আমরা একটা নতুন ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত হওয়া দেখলাম। তাদের হাসিমুখ গানটি প্রথমেই মনে ধরে যায়। তখন বাংলাদেশের প্রায় কেউই এই ব্যান্ডের নাম জানেনা। কিন্তু আমাদের হলগুলোতে রুমে রুমে এই গান প্রায়ই শোনা যেতো। আমার মেডিকেল বা অন্য ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের হাসিমুখ গানটার কথা বললে তারা বলত তোদের বুয়েটের ব্যান্ড তো, তাই তোরা এত প্রশংসা করিস …

পরে আনিসুল হক তার জনপ্রিয় 69 নাটকে তুহিন (শিরোনামহীনের ভোকাল) ভাইয়ের হাসিমুখহয়না গান দুটি কয়েক জায়গায় ব্যবহার করেন। আনিসুল হক এভাবে সাহায্য না করলে হয়তো শিরোনামহীন এর প্রচার এত তাড়াতাড়ি হতো না। হাসিমুখ উপহার দিয়েই তারা থেমে থাকেনি। নতুন অ্যালবামের ইচ্ছে ঘুড়ি, পাখি গানগুলো তো আমি বলবো ব্যান্ডের জগতে সম্পদ। আমার নিজের কাছে তাদের হাসিমুখ, জাহাজী, হয়না, নিশ্চুপ আঁধারে, নদী, শহরের কথা, ইচ্ছে ঘুড়ি, পাখি, বর্ষা – গানগুলো প্রথম সারির গান মনে হয়। আমার সেই মেডিকেলের বন্ধুরাই এখন বলে দোস্তো, কী গান বানাইলো রে, ডেইলী ইচ্ছে ঘুড়ি গানটা না শুনলে তো ঘুমই আসেনা! কিংবা অনেকের কাছে এখন পুরোনো হাসিমুখ গানটি নতুন মাত্রা পাচ্ছে…

সমসাময়িক ব্যান্ডগুলোর সাথে শিরোনামহীনের পার্থক্য – গানে সরোদের ব্যবহার। এই বাদ্যযন্ত্রটিকে তারা বেশ ভালই কাজে লাগিয়েছে। আর তুহিন ভাইয়ের বড় বড় টান (এটাকে সংগীত শিল্পীরা কি বলে জানিনা) তো আছেই। এতই দীর্ঘ টান যে সেগুলো কনসার্টে দেয়া সম্ভব হয় না। তাই কনসার্টে এই টানের জায়গাগুলো আসলে তুহিন ভাই কিভাবে যেন সুরটা একটু পরিবর্তন করে তাড়াতাড়ি গেয়ে ফেলেন। আর তখন তিনি মিটিমিটি হাসতে থাকেন, কারণ বোঝেন যে আমরা মূল টান-টা মিস করছি।

তুহিন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় কয়েক মাস আগে। উনি শেরে বাংলা হলে থাকতেন, তাই মাঝে মাঝে এখনও আসেন। হাতে সারাক্ষণ সিগারেট, মুখ হাসি হাসি। আগে ট্রিপল-এইচ এর মত লম্বা চুল ছিল, এখন কেটে ফেলেছেন। গান গাইতে যওয়ার আগে খুব টেনশনে থাকেন, দেখা হলে বলেন দোয়া কোরো …। পরে যদি বলি তুহিন ভাই, ওই গানটা joss হইছে, তখন আনন্দে উনি নিজেই বাচ্চাদের মত হাততালি দিয়ে ওঠেন!

সম্প্রতি মাজার এক ঘটনা শুনলাম। শিরোনামহীন ব্যান্ডের একজন সদস্যের বিদায়ে, তারা গীটারিস্ট খোঁজা শুরু করেছে। তো যা হওয়ার তাই হল, বুয়েটের যাবতীয় গীটারিস্ট তাদের সাথে দেখা করতে লাগলো। তুহিন ভাই তো পড়লেন মহাবিপাকে। এদের কিভাবে সরাসরি না করেন? সবার সাথেই তো ত
ার হৃদ্যতা!একজন অতি উৎসাহী হাল ছাড়তে নারাজ, সে যেভাবেই হোক এই দলের হয়ে বাজাতে চায়। তুহিন ভাই তাকে খসানোর জন্য বুদ্ধি করে বোঝালেন যে, দলে ঢুকতে হলে তাকে অবশ্যই একটা ইলেকট্রিক গীটার নিজের পয়সায় কিনতে হবে! এই ঔষধে কাজ হল, সেই ছেলেটি দমে গেলো। হলে এসে সাবাইকে বলে বেড়াতে লাগলো যে
ইলেকট্রিক গীটার কেনার অভাবে সে শিরোনামহীন-এ ঢুকতে পারছে না…

ও আচ্ছা যে গানটা মাথায় কয়েকদিন ধরে ঘুরছে তা এখানে লিখে ফেলি। তাহলে হয়তো মাথা থেকে নেমে যাবে! এক গান আবার আমার বেশিদিন ভালো লাগে না …

“কিছু সুর তুমি এনে দাও পাখি নাগরিক কোলাহলে
গান গাও তুমি শীষ দাও এই শহুরে দেয়ালে
তুমি ভুলে যাও এই শহরের যত ব্যস্ত-জনকথা
আমি এসেছি তোমার কাছে এনে দাও স্বাধীনতা…
আমি দেখিনি আমি শুনিনি আমি বলিনি অনেক কিছু
আমি জানিনি আমি বুঝিনি তবু ছুটেছি তোমার পিছু…
আমি দেখিনি আমি শুনিনি আমি বলিনি অনেক কিছু
আমি জানিনি আমি বুঝিনি তবু ছুটেছি… তোমার পিছু ।”
(খন্ডিত)

Advertisements