লেখকদেরকে নাকি একটা ব্যাপারে খুব চতুর হতে হয় । সেটা হল তারা সত্য-মিথ্যা যাই বলুক না কেন, সেটা বলতে হবে আত্মবিশ্বাসের সাথে। যেনো পাঠকের মনে লেখকের দেয়া নতুন থিওরীটা কোনো প্রশ্ন জাগাতে না পারে। লেখকের বক্তব্যের দৃঢ়তাই পাঠকের সংশয় উড়িয়ে নিয়ে যায়। এই গুপ্ত রহস্য জেনে যাওয়ার পর যেকোনো লেখা পরলেই আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করি – কোনো ফাঁক আছে কিনা ? অনেকক্ষেত্রে পেয়েও যাই এবং প্রচন্ড আনন্দিত হই লেখকের সীমাবদ্ধতা পেয়ে । কিংবা সেটা আমার মনের ভুলও হতে পারে ! হয়তো লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত ঈর্ষা থেকে এর উৎপত্তি । প্রবন্ধ বা উপন্যাসে অনেকগুলো জায়গায় এসে থমকে দাড়াতে হয় – লেখক এত সুন্দর একটা লাইন কিভাবে লিখলেন! এভাবে কেন আমি আগে ভাবিনি ? কিংবা লাইনটা এত নিরেট কেন ?

একটা ছোট উদাহরণ দেই। এবার চট্রগ্রামে গিয়ে আমার প্রাইমারী স্কুলটাতে গিয়েছিলাম । অনেক বছর পর । অনেক পরিবর্তন হলেও মূল কাঠামো টা আগের মতই আছে। কিন্তু সব কিছু কেমন যেনো ছোট ছোট লাগছিল । আশ্চর্য, মাঠটা এত ছোট ছিলো ! এই যে বারান্দা ; আমি সেখানে গিয়ে দাড়াতেই মনে হল পুরো বারান্দাটাই যেনো আমি দখল করে নিয়েছি । অথচ এইতো সেদিন এখানে যখন আসিফ আর রনি মারামারি লাগলো, তখন বারান্দাটাকে মনে হচ্ছিলো রেসলিংয়ের রিংয়ের মত বড় ! তবে কি আমরাই আকার আকৃতিতে দানবসম হয়ে গেছি ? কি হাস্যকর! সামনের রাস্তাটাও তো মাত্র ১০ ফিট চওড়া । অথচ এই রাস্তাই তখন পার হতাম এদিক-ওদিক ভালো করে দেখে, অতি সাবধানে।

আমি তাকালাম আকাশের দিকে, আর মনে পরে গেল আমার প্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা। তিনি তার আত্মজীবনীতে কি সুন্দর করেই না এই ব্যাপারটা তুলে ধরেছেন !পরিণত বয়সে তিনি যখন আমার মত তাঁর বাল্যকালের স্থাণগুলোতে ফিরে গিয়েছিলেন, সে জায়গাটাতে তিনি লিখেছেন – সবকিছু ছোট হয়ে গেছে, কেবল আকাশটাই আগের মত আছে । আমিও তখন বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সুনীলকে একটা স্যালুট দিলাম – এত সুন্দর একটা লাইন উপহার দেয়ার জন্য । এ কারণেই তো লেখকদের আমি এত শ্রদ্ধা করি। আবার ঈর্ষাও করি ।

একটি ফ্রেঞ্চ কবিতার অনুবাদ পরেছিলাম, যার দুটি লাইন আমার কাছে এখনো অপার্থিব মনে হয় । মনে হয় এরকম লাইন লেখার জন্য পৃথিবীর সকল লেখক ও কবি-র যাবতীয় চাতুরি (দুঃখিত অন্য কোনো শব্দ মনে আসছে না) ক্ষমা করে দেয়া যায় । কিংবা কে জানে হয়ত এই লাইন দুটি কেবল আমার কাছেই ভালো লেগেছে। অন্যদের কাছে আর দশটা কবিতার লাইনের মতই …
লাইন দুটি হলো –

ইদানিং আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখছি যে
তুমি তোমার বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছো …

Advertisements