ডায়েরী

রিজভী

৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০০৬ ইং

সৌরভ ফিরে এসেছে। পনের দিন নিখোঁজ থাকার পর। এই বয়সের একটা ছেলে সপ্তাহ দুএক থাকতেই পারে বাড়ির বাইরে। হয়তো ব্যাপারটা আর সবার কাছে খুব ভয়ঙ্কর নয় ; কিন্তু ছেলেটা যখন সৌরভ তখন ঘটনা অবশ্যই স্বাভাবিক না। এখন তার বয়স কত হবে ? খুব বেশি হলে পঁচিশ। অথচ বাসা থেকে ক্লাস আর ক্লাস থেকে বাসা ছাড়া তার আর অন্য কোনো গন্তব্য নেই। তাহলে সবাই হয়তো বলবেএই ছেলের বেঁচে থেকে লাভ কী? না, তার বিশেষত্ব অবশ্যই আছেসে কখনও সেকেন্ড হয়না টাইপ ছাত্র। এরপরও হয়তো অনেকে বলবেপরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়াটাই কি জীবনের একমাত্র কাজ? তাদের জন্য উত্তরনা, সৌরভ আসলেই জ্ঞানী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত একজন প্রফেসরের সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণামূলক কাজ করছে সে, যার ফলাফল চমক সৃষ্টি করতে পারে। সৌরভের প্রথম শ্রেণীর নিন্দুকেরা সবশেষে তখন হয়তো বলবেভাইরে, মানুষের মন বলেও তো কিছু একটা আছে দাঁতভাঙ্গা জবাব আছে তাদের জন্যও সেই যে বছর দুয়েক আগের দিনগুলোরোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সৌরভ একই জায়গায়, একইভাবে দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকতো। যেখান থেকে কলাভবনের একশ এগারো কক্ষটি দেখা যেতো। যে কক্ষ থেকে ক্লাস শেষে প্রতিদিন একঝাঁক ছেলেমেয়ের সাথে নীলুও বেরিয়ে আসতো। নীলুর ঘটনায় ফিরে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। কারণ নীলুর সাথে সৌরভের নিখোঁজ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। নিন্দুকদের জবাব দিতে গিয়েই তোপ্রকৃতপক্ষে নিন্দুকের ধারণাটাও অলীক। সৌরভের ক্ষেত্রে একদম খাটে না। কোনো বন্ধু নেই যার, যে কোনো ঘটনা ঘটাতে সক্ষম নয়, যে কারো আলোচনার বিষয় নয়; তার জন্য আবার সমালোচনা কিসের ?

সেই সৌরভ আজ পনের দিন নিখোঁজ থাকার পর বাড়ি ফিরে এসেছে।

…………………………………………..***……………………………………………


তাহের সাহেব প্রতিদিনের মতো আজও বিষন্ন মনে অফিসে বসে ছিলেন। ছেলের বাড়ি ফেরার খবর পেয়ে তিনি আর দেরি করেন নি। তখুনি অফিস থেকে বের হয়ে গেলেন। গত পনের দিন ছেলের খোঁজে কী
না করেছেন তিনি। প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রেই নিখোঁজ সংবাদ দিয়েছেন। প্রতিদিনই একবার করে থানায় যেতেন। আত্মীয় স্বজন সবাইকেই খোঁজাখুঁজির কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি ভার্সিটির প্রতিটি ছাত্র শিক্ষকের মাঝেও এ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল।

তাহের সাহেব দুরু দুরু বুকে বাসায় ঢুকলেন। এতদিন পর কেমন দেখবেন ছেলেকে? তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে অফিসে চশমা ফেলে এসেছেন। তাতে অবশ্য সমস্যা নেইকাছের লেখা পড়তে শুধু চশমা লাগে তার।

সৌরভ বসে আছে ড্রইংরুমের সোফায়। হাতে একটা বইমতন কী যেন শক্ত করে ধরে রেখেছে। আসার পর থেকে মা তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আত্মীয় স্বজনেরা অনেকেই চলে এসেছে। তাহের সাহেব সৌরভের চোখে চোখ রাখলেন। সৌরভ বলল,

বাবা, কেমন আছো ?

ভালো, তুই এতদিন কোথায় ছিলি ? কোনো বিপদ হয়েছিল?

কোথায় ছিলাম সেটা বলব না, তবে ভালোই ছিলাম।

তাহের সাহেব জানেন সৌরভ আসলেই বলবে না। চাপাচাপি করেও কোনো লাভ নেই। কেন যেন তিনি ছেলে ফিরে আসার পরও শংকামুক্ত হতে পারছেন না। অতি আদরের একমাত্র সন্তান হলেও বাবামা দুজনেই কোনো এক অজানা কারণে সৌরভকে ভয় পান। তাকে পারতপক্ষে রাগান না।

…………………………………………..***……………………………………………


বাসার পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গত সোমবারে সৌরভ এসেছিল। আজ আরেক সোমবার। সৌরভ কোথায় ছিল এই এক সপ্তাহেও তা কেউ বের করতে পারে নি। এটা হয়তো আজীবন
ই রহস্য হয়ে থাকবে। ছেলে ফিরে এসেছে এতেই সৌরভের মা খুশি। কিন্তু তাহের সাহেবের মনে এখনও খানিকটা ভয় রয়ে গেছে। কারণ ছেলের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন তিনি। এমনিতে সৌরভ খুব চাপা স্বভাবের, তার উপর গত কয়েক মাস ধরে তাকে বেশ চিন্তিত এবং হতাশাগ্রস্ত দেখাতো। কিন্তু সেদিন যখন সৌরভের চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন তিনি, তখনই পরিবর্তনটা টের পেয়েছিলেন। চোখগুলো জ্বলজ্বল করছিল, উৎফুল্ল একটা ভাব।

সৌরভের এ ধরনের চাহনির সাথে তাহের সাহেব পরিচিত

তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে সৌরভ। সব ক্লাসেই মাথায় গোবর ভরা কিছু ছাত্র থাকে। সৌরভও ছিল তাদেরই দলে। নিয়মিত টিচারের মার খেতো। হঠাৎ সে ভয়ানক এক টাইফয়েডের কবলে পড়ে। সেটা একমাস দশদিন স্থায়ী হলো। টাইফয়েডের পর অনেকের চুল পড়ে যায়, কেউ পঙ্গু হয়ে যায়। সৌরভের এ ধরনের কিছু হলো না। বরং একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। প্রচণ্ড মেধাবী হয়ে গেল সে, যা একবার পড়ে বা শুনে তাই মনে রাখতে পারে। এ যেন শাপে বর। তার এই হঠাৎ পরিবর্তনে সবাই অবাক। ক্লাসে যার পাশ ফেল নিয়ে টানাটানি; সে নিয়মিত ফার্স্ট হওয়া শুরু করলো সৌরভের সেই ক্রান্তিকালেও তাহের সাহেব তার চোখে এ ধরনের চাহনি দেখেছিলেন।

…………………………………………..***……………………………………………


রাত আনুমানিক দুইটা। দোতলায় সৌরভের রুমে তখনো আলো জ্বলছে। অবশ্য সবসময়ই রাত জাগে সে। রুমের চারদিকে বড় বড় বুকশেলফে অনেক বই। ময়লার পুরু আস্তরণ জমে আছে। মাঝখানে গোল একটা তেপায়া টেবিল। সামনে একটা কলম আর একটা ডায়েরী নিয়ে বসে আছে সৌরভ। বেশ বড় সাইজের জলপাই রঙের মলাটে সুন্দর করে বাধানো একটা ডায়েরী। গত ছয় মাস ধরে প্রতি রাতে সে এই ডায়েরীটা নিয়ে বসছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এতে একটা কালির আঁচড়ও পড়েনি। কিংবা সৌরভ দিতে পারেনি। কী ক্ষতি ছিল যদি সে দু
কলম লিখতে পারত আর সবার মতো। কিন্তু তা তো সম্ভব না। সে আর সবার মতো নয়। তার যে বলার কিছুই নেই। নিজেকে কোথাও প্রকাশ করতে পারেনি সে। তার সব সাধ, আহলাদ, আনন্দ, দুঃখ, কষ্টের প্রবাহে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্তর্মুখিতা। এই ব্যর্থতা সহ্য করতে না পেরেই তো সৌরভ ডায়েরীর শরণাপন্ন হয়েছিল। আর কোথাও না হোক নিজের ভাবনাগুলোর কলমের খোঁচায় সাদা কাগজে তো প্রকাশ করতে
ারবে। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। প্রতিরাতে শূন্য ডায়েরী রেখে উঠে যেতে হওয়ায় তার মাঝে একটা ক্রোধ জন্ম নিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে
তাকে ঘটনার জন্ম দিতে হবে। এভাবে আর চলতে পারে না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রাথমিক একটা ধাপ মাত্র। যেহেতু এখনো তার কলম চলছে না, তাই এভাবে হবে না। আরো বড় কোনো ঘটনা ঘটাতে হবে তাকে। সেটা হয়তো অচিরেই ঘটতে যাচ্ছে। সৌরভ নিশ্চিত, যে ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে সেটা যতো নিষ্ঠুরই হোক তার কলমে গতি সঞ্চার করবে। হালকা হবে তার বুকের উপর চেপে থাকা পাথর।

…………………………………………..***……………………………………………


সৌরভের রুমের দরজায় আওয়াজ করে জসিম আসল। সৌরভকে খোঁজাখুঁজির ব্যাপারে সেই সবচেয়ে সক্রিয় ছিল।

ভাইজান একটু আসি ?
আয়, এখনো ঘুমাসনি ?
ঘুমামু, ভাইজান একটা কথা ছিল।

কি কথা ? আবার জিজ্ঞেস করবি তো এতদিন কোথায় ছিলাম ?

গত এক সপ্তাহে প্রতিদিনই সে একবার করে এই প্রশ্নটা সৌরভকে করেছে। এ বিষয়ে তার কৌতুহলের শেষ নেই। সৌরভ বলল,

জসিম, আমি ঠিক করেছি একটা মানুষ খুন করে দেখব, কেমন লাগে।

ভাইজান খালি মজা করেন
এতদিন তো মানুষ মারার ট্রেনিংই নিয়েছি। তুই বিশ্বাস করিস না ?
বুঝছি, আপনে আমারে কইবেন না। যাই ঘুমাই

জসিম চলে গেলে সৌরভ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে স্থির দৃষ্টিতে তার ডায়েরীর দিকে তাকিয়ে রইল…

…………………………………………..***……………………………………………


সৎসঙ্গে স্বর্গবাস
, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। কিন্তু সঙ্গহীনদের জন্য কিছু বলা নেই কেন ? নাকি এই পৃথিবীতে শুধু সৌরভেরই কেউ নেই। বিজ্ঞ প্রবাদপ্রণেতাগণ নিঃসঙ্গদের পরিণাম নিয়ে কোনো মন্তব্য করে গেলেই তো সৌরভকে এই নিষ্ঠুর খেলায় নামতে হয় না। হ্যাঁ, সে একটা খুনই করবে এবং সে নিশ্চিত এটা সে পারবে। খুব শান্ত মানুষেরা অন্য সবকিছুর মতো ভয়ংকর কাজগুলোও ঠাণ্ডা মাথায় করতে পারে। যাকে সে খুন করবে, সে উঠে আসবে তার ডায়েরীতে। কলমের সাথে সাথে সে বিচরণ করবে প্রতিটি শূন্য পাতায়। মানুষটি যে কেউ হতে পারে। ধরা যাক নীলু। একই সাথে তো নীলু বাস্তব আর কল্পনা দুই জায়গায় থাকতে পারে না। তাই সৌরভের ডায়েরীর স্বার্থে, কল্পনার স্বার্থে মুছে ফেলতে হবে বাস্তবের নীলুকে। ডায়েরীর নীলুর কাছে সৌরভ নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারবে। সেই নীলু নিশ্চয়ই বাস্তবের মতো অন্য কারো হয়ে যাবে না কিংবা মানুষটা নীলু নাও হতে পারে। কিন্তু ও হলেই যেন ভালো হয়। সৌরভেরও তো মন বলে কিছু একটা আছে।

সৌরভ লোভাতুর চোখে ডায়েরীর দিকে তাকিয়ে থাকে।

ডায়েরীটাও যেন তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে

——————————————- O ———————————————-

বি.দ্র.: স্কেচ দুটি আমার কাজিন জেসি আপুর করা, আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ…

Advertisements