(মূল লেখাঃ সচলায়তন)

ভয়াবহ একটা দিন পার করে আসলাম আজ। না না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি; শরীরের উপর দিয়ে ধকল গেছে এই যা। রিসার্চ গ্রুপের পোস্ট ডক্ আম্মারিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাকে বাসার সামনে থেকে পিক্ করার কথা। ঘুম থেকে উঠে পড়লাম একঘন্টা আগেই। প্রতিদিন রাত জেগে জেগে অভ্যাস এমন হয়ে গেছে যে চাইলেও আগে আগে ঘুমোতে পারিনা। কীভাবে কীভাবে যেন দুইটা-তিনটা বেজে যায়। কিছু মানুষ আছে না যখন ইচ্ছে তখনই ঘুমোতে পারে? মাঝে মাঝে ভাবি এরকম হতে পারলে মন্দ হত না। আমার বন্ধু অর্জুনকে দেখতাম- বিছানায় শটান্ হয়ে শোয়ার সাথে সাথেই ঘুম! তার কাছেই শুনেছি যে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যুদ্ধের মাঝেই ঘোড়ার পিঠে টুক্ করে ঘুমিয়ে নিতেন। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন এই দশ মিনিটের ঘুম নাকি খুব কার্যকর। জানিনা কতটা সত্যি, তবে মাঝে মাঝে হঠাৎ ক্লাসে কিছুক্ষন ঘুমিয়ে উঠলে যে সাংঘাতিক ফ্রেশ লাগতো তাতে কোন সন্দেহ নেই!

আগের রাতের ভাত গরম করে মাংস আর ডাল দিয়ে খেয়ে নিলাম। এমনিতেই এত সকালে খাবার গলা দিয়ে নামতে চায়না, তার উপর ভাত। কিন্তু খেতে তো হবেই, একমাত্র ভাতই পারে আমাকে পরবর্তী আট দশঘন্টা ক্ষুধামুক্ত রাখতে! যাচ্ছি আমরা সমুদ্রে- গালফ্ অব মেক্সিকো’র ধারে টাম্পা বে’তে। তিনজন মিলে ওয়াটার স্যাম্পল কালেক্ট করব।

টিফিন হিসেবে ভেজে নিলাম কয়েকটা বোম্বাই টোস্ট। পরে নৌকায় বসে সবাই মিলে খাওয়ার আগে বলছিলাম যে প্রবাস জীবনে রান্নাবান্নায় এখনো আমার ‘ট্রায়াল এন্ড এরর্’ মেথড চলছে। আম্মারিন কথাটা লুফে নিল, একটা টোস্ট হাতে নিয়ে বললো- ‘হোপ দিস্ ইজ নট দ্যা এরর্’। লোকটা খুব মজার। সেই কবে পি.এইচ.ডি. শেষ করে ফেলেছে অথচ বয়সে মনে হয় আমাদের চেয়ে ছোট। এই থাই-চাইনিজ-জাপানীজ লোকগুলার বয়স বোঝা দায়। কখোনই মেলাতে পারিনা!

গাড়ী ভর্তি ইকুইপমেন্ট নিয়ে আমরা রওনা দিলাম টাম্পা বে’র উদ্দেশ্যে। রাতে মাত্র চার ঘন্টা ঘুমালেও প্রথমবারের মত সমুদ্রে যাচ্ছি ভেবে বেশ উত্তেজিত আমি। দুই ঘন্টা পর পৌঁছলাম সমুদ্রের পাড়ে। প্রায় পনের ফুট লম্বা একটা স্পিড বোট ভাড়া করা হল। আট ঘন্টার জন্য কোম্পানীকে দিতে হবে সাড়ে পাঁচশ ডলার। বোটম্যান এর নাম র‌্যান্ডি। বয়স ত্রিশ এর মত হবে। আমাদেরকে দেখে বেশ খুশি হয়ে বলল, ‘দ্যাট্‌স গ্রেট, অ্যা’ম পার্ট অব ইওর রিসার্চ দ্যান’।

প্রথম আধ্‌ঘন্টা ভালই লাগল। সমুদ্রের বেশ ভেতরে চলে এসেছি ততক্ষণে। তারপরই শুরু হল প্রচন্ড বাতাস আর বড় বড় ঢেউ। আমাদের নৌকা বেশ বড় আর মজবুত, ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। আমি আর ন্যাট দুজনের কেউই এই পরিবেশের সাথে পরিচিত নই। প্রতি বিশ মিনিট পরপরই আমরা পাল্লা দিয়ে বমি করতে লাগলাম। র‌্যান্ডি আমাদের একটা টেকনিক শিখিয়ে দিল- দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকলে নাকি এরকম হবেনা। কথা সত্যি, খারাপ লাগা কিছুটা কমে।

আমাদের কাজ হল প্রতি একমাইল পর পর স্যাম্পল নিয়ে কিছু প্যারামিটার টেস্ট করা, অবশিষ্ট স্যাম্পলের পি.এইচ. অ্যাডজাস্ট করে বরফে ঢুকিয়ে রাখা যেন ভার্সিটির ল্যাব পর্যন্ত আনতে আনতে ভাল থাকে। তিনটা স্যাম্পল নেয়ার পর আমরা জানতে পারলাম আম্মারিন এরকম পঞ্চাশটা নিতে চায়। শুনে আমি আর ন্যাট একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। একেতো বমির ধাক্কা, তার উপর প্রতিটা স্যাম্পলের উপর কাজ। নাহ্! এ অসম্ভব- তাই বলে পঞ্চাশটা! আম্মারিন বললো এই ডাটা নাকি কোন্ সফট্ওয়্যারে ইনপুট দিতে হবে, তাই বেশি করে লাগবে। এমনিতেই প্রজেক্টটা আমার না, তার উপর প্রফেসর যখন বলেছিল ‘আম্মারিনের সাথে তুমি যেতে পার, হ্যাভ ফান’ তখন কেন যে এত উৎসাহ দেখিয়ে রাজি হয়েছিলাম। নিজের উপরই রাগ হচ্ছিল।

পাঁচটা-দশটা এভাবে করে পনেরটা করে ফেললাম। বমি আর হচ্ছে না, ঢেউ কমে যাওয়া নাকি দিগন্তের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাজ করার কারণে জানি না। কিন্তু আরও তো পয়ত্রিশটা বাকি আছে। নাহ্ এ কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। পাশাপাশি এও ভাবছিলাম যে এটাই আমার জীবনে সবচেয়ে খারাপ দিন কী না! এরপর একটু রক্ষা পাওয়া গেল, লম্বাটে একটা চরে আমাদের নৌকা থামলো। এত সরু চর সমুদ্রের মাঝখানে থাকতে পারে ধারণা ছিলনা। আমরা ডাঙ্গা পেয়ে সাথে সাথে নেমে পড়লাম। এই প্রথম উপলব্ধি করলাম জাহাজে মানুষের শুরুতে কত কষ্ট হয় খাপ খাওয়াতে। শুনেছি ওখানে ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে রুমে আটকে রাখা হয়। হায় খোদা দিগন্ত দেখারও সুযোগ নেই!

র‌্যান্ডি বলার পর খেয়াল করলাম এই চরটা আসলে বালির না। পায়ের নিচে কেবল ঝিনুক আর ঝিনুক। আশ্চর্য, শুধু ঝিনুকেরও দ্বীপ হয়! অনেক রকম পাখিরও আস্তানা এটা। র‌্যান্ডি নাকি প্রায়ই তার বাচ্চাদের নিয়ে বিকেলে চলে আসে এখানে। কী সৌভাগ্য তাদের!

এরপর পানির গভীরতা খুব বেশি ছিলনা। বাতাস-ঢেউ দুটোই পরিমিত। তাই সী-সিকনেস কাটিয়ে উঠেছি আমরা দুজনেই। মনকে খুশি করার জন্য প্রবোধ দিলাম- বাতাস, ঢেউ এইগুলা না বরং আমরাই খাপ খাইয়ে নিয়েছি…

ঘুরেফিরে মনে পড়ছিল তিন গোয়েন্দার ‘অথৈ সাগর’ বইটার কথা। একসময় কী মন্ত্রমুগ্ধের মতই না পড়তাম সমুদ্রযাত্রার গল্পগুলো। ‘দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’র কথাই বা বাদ দেই কেন।

ত্রিশটা স্যাম্পল কালেক্ট করার পর আমাদের সময় শেষ। আমার আর ন্যাট এর আনন্দ দেখে কে। আম্মারিনকে এতেই খুশি থাকতে হল। পরে সে নিজেও বলছে যে আমরা যদি পঞ্চাশটা টার্গেট না করতাম তাহলে এতগুলা নিতে পারতাম না। র‌্যান্ডিও স্বীকার করল যে আগে কখনো সে একদিনে পুরো টাম্পা বে ঘোরেনি। আজ তার ফুয়েল খরচ ছিল সর্বাধিক।

তীরে ফেরার পথে সাগর পাড়ে অনেকগুলি বাড়ি চোখে পড়ল। র‌্যান্ডি বললো এই বাড়ির দাম অনেক বেশি। কারণ একটাই- সাগর। আরও লক্ষ্য করলাম প্রতিটা বাড়ির সামনে হরেক রকমের নৌকা, স্পিড বোট, বজরা ইত্যাদি। এত রকম নৌযান আমি জীবনে দেখিনি। র‌্যান্ডি ব্যাখ্যা করে বলল, যদি বোটের মালিকই না হতে পারে তাহলে আর এত খরচ করে সাগর পাড়ে থাকা কেন? পানি তো মানুষ সুইমিং পুলেই পায়। তাই কেবল সৌখিনরাই এদিকে থাকে। আরও মজার ব্যাপার হল পাড়া-পরশীদের মাঝে একটা প্রতিযোগিতা কাজ করে- কে কার চেয়ে আকর্ষনীয় বোট কিনতে পারে। আমরা যেটা ভাড়া করেছি সেটার দামই নাকি বিশ হাজার ডলার। এলাকার সবচেয়ে নামকরা বোটের কাছে নিয়ে গেল ও। নৌকা বললে ভুল হবে, ছোটোখাট একটা জাহাজ। কুক, মেইড আর জন পাঁচেক ক্রু না নিয়ে এটা নাকি বের হয়না।

ফেরার পথে ড্রাইভ করল ন্যাট। ওরা দুইজনই থাইল্যান্ডের। ভালই ভদ্রতা জানে, আজ সারাদিনে তারা একবারো নিজেদের মধ্যে থাই ভাষায় কথা বলেনি। রোদে পুড়ে বিদ্ধস্থ অবস্থায় আমরা ফিরে আসলাম ভার্সিটিতে। এখন মনে হচ্ছে ভালই তো একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেল কিশোর-রবিন-মুসাদের মতন অথৈ সাগরে। কিন্তু পঞ্চাশটা স্যাম্পল নেয়ার কথা শুনে আমাদের মাথায় আজ যে আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল তা বোধকরি কখনই ভুলবোনা…

Advertisements