(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

শায়ের খান কল্লোলের একটা রম্যরচনা পড়েছিলাম- ‘রোযা যাদের রোজ-আ’, মানে রোজ আহার আর কী। ফাঁকিবাজ একদল লোক রোযা ভাঙ্গার পায়তাঁরা করতে করতে অতি সন্তর্পণে ঢুকে পড়ল কালো কাপড়ে ঢাকা এক রেস্টুরেন্টে। এখন কোন কারণ ছাড়া হুট করে তো আর রোযা ভেঙ্গে ফেলা যায় না। ধর্মের নানাবিধ আইন কানুন নিয়ে উচ্চমার্গীয় আলোচনা করতে করতে একজন বের করে ফেলল- মিষ্টি খাওয়া যেহেতু সুন্নত,  সেই সুন্নত পালন করতে গিয়ে ফরজের সাথে কনফ্লিক্টটাই পুরো সিস্টেমের একটা লূপহোল। তো সেই সুন্নত পালন করার নিমিত্তে তারা অর্ডার দিয়ে বসল প্লেটভর্তি মিষ্টি! শুধু মিষ্টিতে কী আর দুপুরবেলা পেট ভরে? সেই সেহরী থেকে না খাওয়া! একজন বেশ চিন্তিতমুখে প্রশ্ন তুলল, ‘আচ্ছা পরটা জিনিসটা কি জাতীয়- ঝাল না মিষ্টি?’ কথাটা লুফে নিল আরেকজন- ‘ভাল জিনিস মনে করেছেন তো। পরটা হল নিউট্রাল খাবার, এটাকে ঝালের সাথে খেলে ঝাল আর মিষ্টির সাথে খেলে মিষ্টি বলে গন্য করা যায়।’ এরপর আর যায় কোথায়- ‘ওয়েটার, তিনটা করে পরটা সবার জন্য। এদিকে বিশ্বজয়ীর ভঙ্গিতে সবার দিকে তাকালেন যিনি এইমাত্র পরটার ক্লাসিফিকেশান আবিষ্কার করলেন। ভুরিভোজের পর বের হয়ে একজন স্বভাবসুলভভাবে এগিয়ে গেলেন পানের দোকানের দিকে। চিৎকার করে উঠলেন আরেকজন, ‘না না মশাই, ঐ কাজটি ভুলেও করবেন না। রোযার দিনে পানাহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ!!!’

রমজান আসলেই সংযমের চেয়ে বরং খাবার দাবারের পরিমাণ আমাদের বেড়ে যায় বলে ভাবলাম এই মজার গল্পটা শেয়ার করি। এবারই প্রথম রমজান মাস কাটাচ্ছি দেশের বাইরে। চৌদ্দ ঘন্টা রোযা রাখতে হবে শুনে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম প্রথমে। গতকাল জাহিদ ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল, জানালেন কানাডায় উনাদের আঠারো ঘন্টা রোযা রাখতে হচ্ছে! এই কথা শোনার পর এখন আর অতটা কষ্ট হচ্ছে না। ল্যাবেই অধিকাংশ সময় কেটে যায়। দিনশেষে আরেফিন ভাই ড্রাইভ করে আমাদের চার-পাঁচজনকে নিয়ে যায় মাইল দুয়েক দূরের এক মসজিদে। ওখানে প্রতিদিন ফ্রী ইফ্‌তার আর ডিনার। মিড্‌ল ইস্টের লোকজনই বেশি দেখলাম। খাবার বেশ ভাল, ওইদিকের রান্নাই বোধহয়। আশেপাশের এলাকা থেকে একেক দিন একেকজন খাবার নিয়ে আসে। মাসের ত্রিশ দিনই নাকি বুক্‌ড! মানে কে কোনদিন খাবার আনবে। মনে হল এই ব্যবস্থা যেন আমাদের মত গ্র্যাড স্টুডেন্টদের জন্যই Laughing

গত কয়েকটা রোযার মাস এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। হলে সিজানই ছিল সার্বিক তত্ত্বাবধানে। তার রুমে প্রতিদিন ইফ্তার করতাম আমরা। সিজান অনেক সময় নিয়ে যত্ন করে বানাতো সালাদ। সজীব বানাতো শরবত। তার বোধহয় নামও হয়ে গিয়েছিল শরবত আলী। আমি খেজুর আর গ্লাস ধুয়েই খালাস! মামুন, রিজওয়ান ইফ্তার কিনে আনতো। আমিও মাঝে মাঝে যেতাম। অনিয়মিত হলেও নিশাত, অয়ন সহ আরও অনেকেই যোগ দিত এই আয়োজনে। পেপারের উপর বিশাল এক পাহাড় হয়ে যেত সবকিছু মেশাতে মেশাতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এই পাহাড় শেষ হতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগতো না। সিজানের এই ইফ্তার খাওয়ার পরে অন্য ইফ্তার আর ভাল লাগতো না। এমনকি বাসারটাও না! ইফ্তার খেয়ে আমরা বসে যেতাম গেইম খেলতে। আমি জয়স্টিক নিয়ে আসতাম (যে জয়স্টিক অন্যদের ধরতে না দেয়াতে সবাই আমার উপর ক্ষ্যাপা ছিল)। তাছাড়া হলের কম্পিউটারগুলো একটা আরেকটার সাথে ল্যানে কানেক্টেড ছিল। তাই অনেকেই একসাথে ফিফা’র ফুটবল খেলতে পারতাম। কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না, তবে একথা সত্যি যে আমরা ইফ্তার খেয়ে বসতাম আর উঠতাম একেবারে সেহরীর সময়! এখানে আমি মাঝে মাঝে আরেফিন ভাইয়ের সাথে বা চায়নিজ কলিগ জেমীনের সাথে দুই এক ঘন্টা যে খেলি, সেটা তাই আর গায়ে লাগে না। মনে হয় এইমাত্রই না বসলাম, অথচ সে উঠে যেতে চাচ্ছে কেন। হলের খুব কাছে হওয়ায় প্রায়ই খালার বাসায়ও চলে যেতাম ইফ্তারের আগে। ওখানেও চলত বাছিরের সাথে ফাইট। তবে বেশিরভাগ সময়ই ওর সাথে হারতাম বলে মেজাজ প্রচন্ড খারাপ করে হলে ফেরত আসতাম। সিজান-সজীবদের কাছে বেশ সতর্কতার সাথে গোপন করে যেতাম যে আমার সাথে বাছিরের ফিফাতে পারফরম্যান্স অনেক ভাল।

অনেকবার ইফ্তার করেছি আমার দুই ছাত্র শাহেদ আর সাইফের বাসায়। ওদের বাসায় গেলে আমাকে প্রচুর খাওয়াত। আর ওদের সাথে এমনিতেও অনেক ফ্রী ছিলাম। একদিন ঠিক করলাম আমি, শাহেদ আর বাছির যাব বুফেতে পিজ্জা খেতে। রমজান মাসেই এই অফার দেয় ওরা। এইরে! রেস্টুরেন্টের নাম ভুলে গিয়েছি। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলাম Frown। যাই হোক, ভোজনরসিক হিসেবে শাহেদের আবার সুখ্যাতি আছে। সাইরেনের সাথে সাথে খাওয়া শুরু করলাম প্রতিযোগীতা করে। শাহেদ ইনিংস শেষ করল এগারোটা পিজ্জা খেয়ে। আমিও কম যাইনি- নয়টা। আর বাছির আমাদের তুলনায় ফেইলই করেছে বলা যায়- মাত্র সাতটা কী সাড়ে ছ’টা। ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করল আমরা কেমন খেতে পেরেছি। শাহেদ বেশ বীরের ভঙ্গিতে বললো, ‘এগারোটা।’ ওয়েটার হেসে বললো, ‘ধরতে পারলেন না তো স্যার। এখানে ষোলটা খাওয়ার রেকর্ড আছে।’ শাহেদের হাসি ধীরে ধীরে মিইয়ে গেল…

হল ছেড়ে দেয়ার পর বাসা ভাড়া করে থাকতাম আমি, অর্জুন, মামুন, শিমুল আর শান্ত। হল পরবর্তী জীবন নিয়ে আরেকদিন লেখা যাবে। অনেক গল্প জমা আছে। তবে ইফ্তার করতে বসলে শিমুলের কথা মনে পড়ে বেশি। গতবছর এইদিনগুলিতে আমি আর শিমুলই বাসায় থাকতাম ইফ্তারের সময়। অর্জুন প্রায়ই তার ভার্সিটিতে থাকত। আমার আর শিমুলের প্রিয় খাবার ছিল গ্রিল চিকেন। আবিষ্কার করেছিলাম দুর্দান্ত এই জিনিসটা ইফ্তারের বুট-পেঁয়াজুর সাথে বেশ ভাল যায়। অর্জুনের আন্দাজ আবার একটু কম-  বাসার তিনজন মাত্র মানুষের জন্য একবার তিনশো টাকার হালিম নিয়ে আসলো। খেয়ে আর শেষ করতে পারি না!

রমজান মাসের স্মৃতি আসলে আরও অনেক আছে। হুড়মুড় করে অনেক কিছুই মনে পড়ছে। আবার অনেক বড়বড় ঘটনা বাদও পড়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন সানরাইজে কোচিং করতে ঢাকায় আসার পর যেবার আমি বিশ দিনব্যাপী টাইফয়েডে পড়লাম, সেটা ছিল রমজান মাস। ছিলাম মিরপুরে চাচার বাসায়। ওদের এত সেবাযত্ন পেয়েছি তখন যে তা না হলে হয়ত আমার ঐ অবস্থায় ভার্সিটিতে চান্স পাওয়াই হত না।

শেষ করি। অনেক প্যাঁচাল হল। বন্ধুরা যে যেখানে আছে ভাল থাকুক। খুব ভাল।

Advertisements