(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

আজ প্রায় আট মাস হয়ে গেল এখানে। বছর দুয়েক আগে প্ল্যান ছিল যেভাবেই হোক ২০০৯ সালে আমেরিকা যাব ফল সেমিস্টার ধরতে। সবকিছু পুরোপুরি প্ল্যান অনুযায়ী না হলেও শেষ পর্যন্ত প্লেনের টিকেট ডিসেম্বরের সাতাশ তারিখে কেটে নিজেকে অন্তত প্রবোধ দিলাম- নাহ্‌, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০০৯ সালেই আমেরিকা যাচ্ছি!

এই সিরিজে চেষ্টা করব আমেরিকা সংক্রান্ত আমার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে। নিতান্তই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। তাই আমি যদি বলি আমেরিকানরা খুব টকেটিভ- এই বাক্যটাকে কেউ যেন সিদ্ধান্ত হিসেবে না নেয় সে অনুরোধ রইল। কখনও কখনও আমার আশেপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণও শেয়ার করব (অবশ্যই রেফারেন্স টেনে)। কিংবা ডায়েরীর মত কোন এক দিনের টুকরো গল্পও স্থাণ পেতে পারে।

ওয়াশিংটনে নেমেই গাছপালা দেখে মনে হচ্ছিল একটু বেশি গাঢ় রঙের। গাঢ় সবুজ; দেশের মত কাঁচা সবুজ না। ঘাসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আর অনেক শক্ত, দেশের নরম ঘাসের মত না যে খালি পায়ে হাঁটা যায়। আগে ছবিতে দেখতাম এখানকার গাছগুলো অনেক পরিকল্পিতভাবে লাগানো। যেমন একটা রেস্টুরেন্টের বাইরে ডানে দুইটা গাছ, আবার বামেও একই রকম দুইটা গাছ। পরে জানলাম, এগুলো ছোট থেকে যে এখানে বড় হয়েছে তা না। ট্রাকে করে আস্ত গাছ এনে জায়গামত বসিয়ে দিয়ে যায়! এমনকি ঘাসও যেখানে যেখানে কমে গেছে বলে মনে হয়, কিনে এনে বসিয়ে দেয়। এ কারণেই ছবিতে বিল্ডিং আর গাছের কম্বিনেশান এত ভাল দেখায়।

ঢাকার ভয়াবহ ট্রান্সপোর্টেশান সিস্টেম থেকে বিশ্বের সর্বাধুনিক ট্রান্সপোর্টেশান সিস্টেমে এসে পড়ায় পার্থক্যগুলো একটু প্রকটভাবেই ধরা পড়ছে চোখে। রাস্তাগুলো অনেক প্রশস্ত। এমনিতে দেখে মনে হয় গাড়ি আস্তে চলছে। কিন্তু সাধারণ একটা রাস্তাতেও গাড়ির স্পীড অনেক বেশি। যেকোন পয়েন্টেই রাস্তা পার হওয়া যায় না। আর অবৈধভাবে পার হতে চাইলেও গাড়িগুলো এত জোরে চলে যে, দূরের একটা গাড়িও মুহূর্তের মাঝেই চলে আসে! রাস্তার মোড়ে মোড়ে সুইচ আছে, চেপে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। সিগন্যালের পর কাউন্টডাউন চলতে থাকে, ঐ সময়ের মধ্যে চোখ বন্ধ করেও রাস্তা পার হয়ে যাওয়া যায়। কোনদিক থেকেই গাড়ি চলে আসার চান্স নেই তখন। এখানে পথচারীদের অগ্রাধিকার অনেক বেশি। সামান্য ছোটখাটো রাস্তায়, যেখানে সুইচ সিস্টেম নেই, পার হতে যেয়ে দেখি অনেক দূরে গাড়ি অপেক্ষা করে আছে কিংবা হাতের ইশারায় বলছে যে আগে তুমি পার হও তারপর আমি। আসলে ড্রাইভাররা পথচারী দেখলেই ভয়ে ভয়ে থাকে। কারণ একটু টাচ্‌ লাগলেই বিশাল অঙ্কের ডলার দিতে হবে ঐ পথচারীকে। এমনও শুনেছি কেউ কেউ (নিশ্চয়ই পাগল টাইপের কেউ) ইচ্ছে করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে গাড়ির সামনে স্রেফ ঐ বিশাল অঙ্কের ডলারের লোভে! ঢাকায় আমাদের রাস্তায় চলতে হত গাড়ির মর্জি বুঝে, ফাঁকফোকর দিয়ে। আর এই কয়মাসেই এখানে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে এখন রাস্তায় কোন গাড়ি আমাদের কাছাকাছি চলে আসতে দেখলে বলে উঠি- ড্রাইভারটা ভারী বেয়াদব তো!

অরল্যান্ডোতে অনেক টোল রোড। সেইসব রাস্তায় ওঠার সময় সয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্ক্যান করে কেটে নেবে ক্রেডিট কার্ড থেকে নির্ধারিত টোল। তারমানে টোল দেয়ার জন্য থামারও দরকার নেই! মাঝে মাঝে পুলিশ পাশে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। ড্রাইভ করার সময় পান থেকে চুন খসলেই জরিমানা। সেই জরিমানা আবার অত্যাধিক, দেখা গেল ন্যূনতমটাই একজনের একমাসের খাবার খরচের সমান। আমার ভার্সিটির ক্যাম্পাসেও পার্কিং বা স্পীড একটু এদিক সেদিক হলেই জরিমানা। শুনেছি এটা তাদের আয়ের একটা বড় উৎস! তবে, এত এত আধুনিক সিস্টেম আর নিয়মের কড়াকড়ি সত্ত্বেও এখানে অ্যাক্সিডেন্ট হয় প্রচুর। বিশেষ করে উইকেন্ডগুলোতে, অনেকেই ড্রাঙ্ক হয়ে বেপরোয়াভাব গাড়ি চালায়। তাছাড়া বেশিরভাগ ড্রাইভারের কানেই আমি দেখি সেলফোন।

আরেফিন ভাই সেদিন মজা করে বলছিলেন, এখানে অ্যাক্সিডেন্ট হলে বাংলাদেশের মানুষের মত দুইপক্ষ ঝগড়া শুরু করে দেয় না। কেউ আহত না হলে, আস্তে করে নেমে বেশ আগ্রহ নিয়ে ভাঙ্গা গাড়ির ছবি তুলতে থাকে। তারপর যে যার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীকে ফোন করে। ততক্ষণে কেউ একজন ৯১১ এ কল করে পুলিশ নিয়ে আসে। পুলিশ দুইপক্ষের নাম ঠিকানা নিয়ে দশ মিনিটের মধ্যেই বিদায় নিবে। প্রয়োজনে বড় ট্রাক এসে ভাঙ্গা গাড়ি রাস্তা থেকে সরাবে। এরকম ছোটখাটো ক্র্যাশ হরহামেশাই হচ্ছে এখানে। তবে কেউ নিহত হলে অবশ্যই ভিন্ন কথা।

তুরেন ভাইয়া একবার রাস্তার আইল্যান্ড দেখিয়ে বলছিলেন, এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা যে অ্যাক্সিডেন্টের সময় গাড়ি যদি রাস্তার পাশের আইল্যান্ডে উঠেও যায় তাহলে তা আবার একপাক ঘুরে রাস্তায় ফিরে আসবে। মানে আইল্যান্ডের ডিজাইন, ঐ রাস্তায় গাড়ির গতি ইত্যাদি নিয়ে কোনভাবে করা একটা মেকানিক্‌স। শুনে বেশ অবাক হয়েছিলাম!

(চলবে)

Advertisements