(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)


ঢাকা ছেড়ে আসার প্রায় দুই দিন পর ফ্লোরিডা এসে পৌঁছলাম। এর কারণ কাতারে ঊনিশ ঘন্টা ট্রানজিট। ঢাকার বিমানবন্দরে ফ্লাইটের প্রাক্কালে যখন বিমান-বালা’র দল ক্যাটওয়াক করে প্লেনে উঠল, তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম তাদের রূপ দেখে! আর কাতার এয়ারওয়েজের মেরুন পোষাকও চমৎকার মানিয়েছিল তাদের। পরে জানলাম, এদের বেশিরভাগই ফ্রেঞ্চ নয়তো ইতালিয়ান। লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম জর্ডানের এক লোকের সাথে। তাবলীগের কোন কাজে ঢাকায় এসেছিলেন। আমার কিংবা তার নিজের চিত্তচাঞ্চল্য উপলব্ধি করেই হয়ত বড়সড় একটা ধর্মীয় বয়ান ওখানেই দিয়ে দিলেন আমাকে।

মাত্র ছয় ঘন্টায় চলে আসলাম কাতারের রাজধানী ‘দোহা’য়। প্লেন থেকে নিচে তাকিয়ে প্রথমেই যে শব্দটা মাথায় আসল তা হল- ‘খাঁ খাঁ’। চারিদিক আসলেই খাঁ খাঁ করছিল। প্রচন্ড রোদের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বিল্ডিং। মরুভূমির উপর গড়ে ওঠা শহর।

রাতে থাকার জন্য বিমানবন্দরের বাইরে ‘মারকুরি গ্র্যান্ড’ নামে এক পাঁচতারা হোটেল দেয়া হল আমাকে। অতএব, কাতারের ভিসা পেলাম একদিনের জন্য। দুপুরে খেয়েদেয়ে ঢাকায় একটা ফোন করে জানালাম যে আমি ঠিক মতই এসেছি। আর ফোন করলাম বন্ধু সজীবকে। ও কাতারেই থাকে। তবে মাঝখানে বছর পাঁচেক ঢাকায় ছিল বুয়েটে আন্ডারগ্র্যাড করার সময়। আধঘন্টা পরেই আমার রুমের দরজায় আওয়াজ শুনে গেলাম। দরজা খুলে দেখি মুখে একরাশ হাসি নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম আমার ফ্লাইটের সময়সূচী, তারপরও আমাদের দুজনের কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে এভাবে বুয়েটের তিতুমীর হলের কোন বন্ধুর দেখা পাব! সজীব বলল, ‘চল্‌ বের হই। আজ তোকে পুরো কাতার দেখিয়ে ফেলব, সাথে গাড়ী আছে।’

সজীব সরাসরি অফিস থেকে এসেছে। তখন তার কাজের চাপ ভালই ছিল। তারপরেও কেবল আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য অফিস থেকে আগে আগে বের হয়ে পড়েছে। ফোন করে জড়ো করল তার আরও দুই বন্ধু নাঈম আর আদিলকে। কাতার দেশটা খুব একটা বড় না। ড্রাইভ করেই মনে হয় পুরোটা দেখে ফেলা সম্ভব। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম রাস্তাঘাট বেশ ঝক্‌ঝকে। সবকিছু একেবারে নতুন, আশেপাশের বিল্ডিংও। কাতারে যে ট্রান্সপোর্টেশান সিস্টেম দেখে এসেছি সত্যি বলতে কি আমেরিকায় এসেও খুব একটা পার্থক্য টের পাইনি। নাঈমের বাবা পরে জানালেন, পুরো দেশটাই খুব নতুন। বিশ-ত্রিশ বছর আগেও বিমানবন্দরের কাছে ছিল কেবল টিনের কিছু ঘর। এই কয় বছরে দেশটা তেল বেঁচে বেঁচে অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তাই বিশ্বের অনেক দেশই যখন আমেরিকার ট্রান্সপোর্টেশান সিস্টেমকে অনুকরণ করছে, কাতারও সেক্ষেত্রে খরচ করতে পিছপা হয়নি।

কিছুক্ষণ রাস্তায় হাঁটাহাটি করলাম, অলিতে গলিতে ঘুরলাম। তারপর সজীব নিয়ে গেল একটা জেটিতে। সারি সারি অনেকগুলো ছোট-বড় নৌকা। চারিদিকে মাছের আঁশটে গন্ধ। জায়গাটা বেশ সুন্দর। জেটি থেকে পানির উপর পা ঝুলিয়ে বসে থাকা যায়। এইটা ওদের নিয়মিত আড্ডা দেয়ার জায়গা। সন্ধ্যাটা কাটালাম ওখানেই চা খেতে খেতে। রাতে গেলাম নাঈমের বাসায়। দোহা’র বাইরে আরেকটা শহর ওয়াক্রাতে। ওর বাবা-মা আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন। মাত্র ছয় ঘন্টার জার্নি হওয়ায় এখানকার বাঙ্গালিরা নিয়মিতই দেশে আসা যাওয়া করে। ওখান থেকে গেলাম ‘লা ভিলাজিও’ নামে খুব বিখ্যাত একটা শপিং মলে। মাথার উপরে তাকিয়ে দেখি তখনও দিনের আলো। অথচ মার্কেটের বাইরে এইমাত্রই না রাত দেখে আসলাম! ভাল করে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম এই আকাশ কৃত্রিম! মার্কেটটা অনেক বড়। আর পুরোটাই মুড়ে দেয়া কৃত্রিম আকাশে। ওপাশ থেকে লাইট দিয়ে কোনভাবে এই দিনের আলো সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউ যদি সারাদিন এর ভেতরে বসে থাকে তাহলে তার জন্য কখনোই রাত হবে না!

ভেতরে দুইধরনের মানুষ- কাতারী আর বিদেশী। কাতারী পুরুষরা লম্বা সাদা/কালো রঙের আলখাল্লা পরে পেছনে দুই হাত দিয়ে বেশ আয়েশী ভংগীতে হাঁটছে। সারাদিনে তারা নাকি তেমন কোন কাজ করেনা। কোন একটা চাকরী করলেও সপ্তাহে যদি দুইদিনও অফিসে যায় তাতেই অফিসটা ধন্য হয়ে যায়। যে কয়জনকে দেখলাম তাতে মনে হল এদের দেহের সাধারণ গড়ন সরু, লম্বা আর মেদহীন। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। মেয়েরা সবাই বোরকা পরা। তবে কারও কারও মুখ বা হাত দেখা যায়। সজীব বলে উঠল, ‘কাতারী মেয়েদের গায়ের রঙ দেখে নে। আমেরিকায় এই রঙ কখনোই দেখবি না। তবে ভুলেও ছবি তুলতে যাস্‌ নে।’ মানুষ তো দূরের কথা, আমি এমনিতেই পুরো মার্কেটের একটা দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার চেষ্টা করছিলাম। সাথে সাথে এক গার্ড কোত্থেকে এসে বললো যে এইখানে ছবি তোলা নিষেধ। তারপরেও লুকিয়ে যে কিছু ছবি তুলিনি তা না। মাত্র এক রাতের জন্য এসেছি, স্মৃতি তো কিছু ধরে রাখতেই হবে…

বিদেশীদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতীয়। দোকানপাট প্রায় সবই চালায় ভারতীয়রা। যে বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমার জন্য তা হল এখানকার প্রচলিত ভাষাও হিন্দী! সজীবকে দেখলাম চোস্ত হিন্দীতে দোকানে চায়ের অর্ডার করছে। আমি আৎকে উঠলাম, ‘তুই হিন্দী বলতে পারস এইটাতো জানতাম না!’ সজীব জানালো, এখানে সবাইকে হিন্দী জানতে হয়। শুধু তাই না, সে আরবীও বলতে পারে। তার প্রমাণ মিললো যখন আমার সামনে ফোনে অফিসের বস্‌ এর সাথে আরবীতে কথা বলল।

নাঈম আমাদেরকে ডিনার করালো লা ভিলাজিও’র ভেতরে এক রেস্টুরেন্টে। তারপরে সজীব ঠিক করল রাতে আই ম্যাক্স মুভি থিয়েটারে ‘আভাতার’ দেখা হবে। তখন সবে এই ছবি বের হয়ে চারদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছে। আমি ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় বারটা। সকাল সাতটায় দোহা থেকে ওয়াশিংটনের ফ্লাইটের জন্য আমার হোটেল ছাড়তে হবে। আর তা টানা চৌদ্দ ঘন্টার জার্নি! তাই আগের রাতে ভাল একটা ঘুম জরুরী। তাছাড়া সারাটা দিনই আমি কাটিয়েছি সর্দি-কাশির কারণে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে। তবে ব্যাপারটা যেহেতু মুভি তাই সজীবের আমাকে রাজী করাতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। তাছাড়া এর আগে কখনো আই ম্যাক্স থ্রীডিতে মুভি দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ ওরা আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিল। তিনঘন্টা ঘুমিয়েই পরের দিন শুরু করলাম। ওয়াশিংটনগামী বিমানে চড়ে দেখি এবার আর সেই ইতালিয়ান বা ফরাসীরা নেই। চৈনিকদের আধিপত্য। যারপরনাই হতাশ হয়ে মুভি দেখা শুরু করলাম। চৌদ্দ ঘন্টায় চারটা মুভি দেখে ফেললাম। এছাড়া আর কিছু করারও নেই। পাশে বসেছে আরব আমিরাতের এক কিশোর। তারও পাশে আমেরিকান এক লোক। আরবের ধনকুবেররা তাদের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার্থে আমেরিকায় পাঠায় অনেক পয়সা খরচ করে। কথা বলে বুঝলাম ছেলেটা সেরকমই একজন। মুভি-মিউজিক-স্পোর্টস্‌ কোনকিছু নিয়েই তার সাথে আড্ডা জমল না। ভাবলাম তার কাছ থেকে আরবী শিখি, সদ্য কাতার ঘুরে এলাম। অনেকদিন ধরে মনের মধ্যে খচখচ করছিল যে তারা জের-জবর (তাশকীল) ছাড়া আরবী লিখে কী করে। সেটা পড়ারই বা উপায় কি? জানলাম কেবল একটা শব্দে জের-জবর না দিলে সেটা বোঝা মুশকিলই বটে, কয়েকটা অর্থ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সমগ্র একটা বাক্যে এ সমস্যা নেই। তারা সেন্স থেকেই বুঝে নেয় এখানে কোন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই দৈনন্দিন কাজে, এমনকি সরকারী দলিলেও একটার পর আরেকটা হরফ বসালেই কাজ চলে যায়। তবে আমাদের ধর্মগ্রন্থে তাশকীল দিয়েই ওরা লেখে যেন সামান্যতম ভুলের সম্ভাবনাও না থাকে।

পাশের আমেরিকান লোকটা সারা পথ ঘুমিয়েই কাটালো। সে বেশ কয়েকটা ঘুমের ঔষধ খেয়ে নিয়েছে শুরুতেই। ভাল বুদ্ধি, চৌদ্দ ঘন্টা বসে থাকা সহজ কথা না। তার সাথে সামান্য কথা হল। আমার পরিচয় দিতেই সে বলে উঠল, আমি তোমাদের দেশের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনেছি। তাঁর উপরে আর্টিক্যালও পড়েছি অনেক। শুনে মনটা ভরে গেল।

(চলবে)

Advertisements