(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

কাতারের ঊনিশ ঘন্টা ট্রানজিট ভাল কেটেছে। শুধু ভাল না, খুব ভাল। সে তুলনায় ওয়াশিংটনে ছয় ঘন্টার ট্রানজিট একটু বেকায়দারই ছিল। বাইরে গিয়ে কিছু দেখার সুযোগ নেই, আবার এতক্ষণ বসে থেকে পরের ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করাটাও কষ্টকর। তখন পুরো আমেরিকাতেই প্রচন্ড শীত। অন্যান্য যেকোন বছরের চেয়ে বেশি। প্লেন থেকে নেমে টার্মিনাল পর্যন্ত বাসে আসার সময় আশেপাশে কিছু বরফ দেখেছি। তবে খুশি হয়ে ওঠার মত কিছু না। ময়লা ময়লা কিছু আধগলা বরফ প্লেনের রানওয়েতে পড়ে আছে আর সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। ওটাকে আমি আমার ‘প্রথম বরফ দেখা’ শিরোনাম দিতে চাই না! বরং আমি অপেক্ষা করতে চাই চিমনীসহ একটা দোচালা বাড়ি-উঠান-রাস্তা-গাছ-গাড়ী সব বরফে ঢেকে সাদা হয়ে আছে এমন একটা দৃশ্যের জন্য। আচ্ছা, ঐরকম শীতে নাকি টোকা দিলে কানের লতি সহজেই ভেঙ্গে পড়ে যায়! কথাটা কি সত্যি?

টার্মিনালে তখন অনেক ভীড়। কারণ সবাই আমার মত ফ্লোরিডা যাচ্ছে। তবে ওরা যাচ্ছে ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে। ফ্লোরিডা বেশ ভাল ট্যুরিস্ট স্পট। সোফায় বসে অপেক্ষা করছি আর আশেপাশের মানুষজন দেখছি। দেখলাম অনেকেই দেয়ালে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে এখানে। নিচে ম্যাট থাকে অবশ্য। আর বলাই বাহুল্য যে একরত্তি ময়লা নেই কোথাও। তারপরেও প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম দেখে। পরে ক্যাম্পাসেও দেখলাম এটা কোন ব্যাপারই না। মানুষজন করিডোরে বসে খাওয়া দাওয়া করে, হোমওয়ার্ক সারে। এর আরেকটা বড় কারণ ল্যাপটপ। তাই যেখানে চার্জ দেয়ার আউটলেট পায় সেখানেই বসে পড়ে। তবে আড্ডা দিতে বসে না কখনো। সেটা করলেই বরং আমাদের চোখে স্বাভাবিক লাগতো। আসলে ‘আড্ডা’ শব্দটারই কোন অস্তিত্ব নেই এদের দৈনন্দিন জীবনে! এটা অবশ্য আমার আবিষ্কার না। আমি দেশে থাকতেও আড্ডা দিয়ে তেমন অভ্যস্ত না। ব্যাপারটা ধরেছেন আরেফিন ভাই। আমেরিকায় এসে উনি সবচেয়ে বেশি মিস করেন এটাই। আরও অবাক হয়েছি ভার্সিটির এক বাস ড্রাইভারের প্রশ্নে। আমরা যেখানে থাকি তার আশেপাশে অনেক ভারতীয়। স্বাভাবিকভাবেই রাতের বেলা অনেকেই দল বেঁধে হাঁটতে বের হয়। তো সেই বাস ড্রাইভার প্রতিদিন এখান দিয়ে যায়। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই যে এত মানুষ দল বেঁধে হাটছে, এটা কি তোমাদের সংস্কৃতির অংশ?

টার্মিনালে ফিরে আসি। সোফায় আমার পাশে বসেছে এক ইংলিশ। কথায় কথায় জানলাম ফ্লোরিডাতে তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে হঠাৎ হাজির হয়ে চমক দিতে চায়। প্রসঙ্গক্রমে ফুটবলের কথা উঠল। আমি চেলসির সাপোর্টার শুনেই মজা করে দুই হাত দূরে গিয়ে বসল। কারণ সে ম্যানইউ’র ভক্ত। ক্ষুধা নিবারণের উদ্দেশ্যে দশ ডলার দিয়ে একটা ফ্রোজেন হট ডগ কিনলাম। একটু খেয়েই ফেলে দিতে হল। ভয়াবহ রকমের বিস্বাদ! এখানে খাবার দাবার অনেক বুঝে শুনে কিনতে হয়। টিভিতে আমেরিকান ফাস্টফুডগুলো খুবই সুন্দর দেখায়। তবে আমরা যারা মশলাদার খাবার খেয়ে অভ্যস্ত তাদেরকে সন্তুষ্ট করা বেশ চ্যালেঞ্জিংই এখানকার ফাস্টফুডগুলোর জন্য। এমনকি কোক-পেপসির স্বাদও অন্যরকম!

মোবাইল ফোনে চার্জ দেয়া জরুরী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দুই পিনের প্লাগের জন্য আউটলেট পুরো টার্মিনাল ঘুরেও খুঁজে পেলাম না। আসলে আমেরিকার সর্বত্রই তিন পিনের প্লাগ ব্যবহার করা হয়। আর দুই পিন হল ইউরোপীয়ান সিস্টেম। টার্মিনালের ভেতরেই ছোটখাট একটা মোবাইল ফোনের দোকান পেলাম। অ্যারাবিয়ান দোকানদার জানাল আমার মোবাইল ত্রিশ মিনিট চার্জ করে দিবে, বিনিময়ে তাকে দশ ডলার দিতে হবে! স্বাভাবিকভাবেই তখন আমি যেকোন ডলারকেই মনে মনে সত্তুর দিয়ে গুণ করে বোঝার চেষ্টা করছি যে ব্যাপারটায় কতটা ঠকে যাচ্ছি। তো কেবল চার্জ করে দেয়ার জন্যই সে বাগে পেয়ে আমাকে বোকা বানাচ্ছে ভেবে একটু হতাশ হলাম। কিছু করারও নেই…

ওয়াশিংটনে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও তিনঘন্টা বেশি থাকতে হল। প্লেনে ওঠার পর তারা কী একটা যান্ত্রিক ত্রুটি আবিষ্কার করল, তাই আবার ফিরে আসতে হল টার্মিনালে। সবশেষে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে এসে পৌঁছলাম রাত দুইটার দিকে। স্যুটকেস দুটো ঠিকমতই হাতে পেলাম, তবে অবস্থা করুণ। আরও খারাপ হতে পারত যদি ঢাকা থেকে হুমায়ূন ভাই চওড়া স্কচ্ টেপ দিয়ে বেঁধে না দিতেন। আমি প্রথমে বেঁধে আনতে চাইনি; কিন্তু উনি অভিজ্ঞতা থেকেই বলেছিলেন যে এগুলো কর্মচারীরা নির্দয়ভাবে ছুড়ে মারে যেখানে সেখানে। আমার অপেক্ষাকৃত দামী ব্র্যান্ডের প্রেসিডেন্ট স্যুটকেসটার লক পর্যন্ত ভেঙ্গে গেছে। অপরদিকে সস্তা স্যুটকেসটার তেমন কিছু হয়নি!

কিছু কয়েন নিয়ে এসেছিলাম পরকল্পনা অনুযায়ী। কয়েন দিয়ে অনেক ভিডিও গেমস্ খেলেছি আগে, ফোন করা হয়নি কখনো। ফোন করার আধঘন্টার মাঝেই গাড়ী নিয়ে চলে আসলেন আরেফিন ভাই আর ঝুমুর আপু। বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে ফেললাম। একেবারে পৃথিবীর অপর প্রান্তে!

(চলবে)

Advertisements