(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

আমেরিকানদের আমি দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছি। একদল আমার দূর্বল ইংরেজীতে বলা কথা চট্‌ করে বুঝে ফেলে। আরেক দলকে প্রায় প্রতিটা বাক্য বা শব্দই দুইবার করে বলতে হয়। সামান্য বিকৃত উচ্চারণও তারা ধরতে পারে না। বিকৃত বলছি এই কারণে যে আমরা বাঙ্গালিরা বা ভারতীয়রা ইংরেজী লেখাতে যতই পারদর্শী হই না কেন উচ্চারণে অবশ্যই কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কম বা বেশি টানের ব্যাপারও থাকে। দেখা গেছে যারা আমার কথা সহজেই বুঝে যায় তারা অন্যান্য দেশের প্রচুর মানুষের সাথে মিশেছে কিংবা পরিবারের বাপ-দাদারা অন্য দেশ থেকে আগত। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন আঞ্চলিকতায় ইংরেজী শুনে অভ্যস্থ। অপরদিকে ওরা যা বলে সামনাসামনি প্রায় সবই বোঝা যায়, মাঝেমাঝে ফোনে একটু কষ্ট হয়। তবে সেটা তেমন সমস্যা না, দৈনন্দিক কথাবার্তা এমনিতেই বোঝা যায়। আমার সমস্যা হয় যখন কয়েকজন আমেরিকানের সাথে গ্রুপে অবস্থাণ করি। দেখা গেল হঠাৎ কেউ একজন মজা করে একটা কৌতুক করল, সবাই হাসছে। কিন্তু ভাষার মারপ্যাঁচের কারণে আমি ধরতে পারিনি!

ব্যাপারটা আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করি। বাংলাতেও আমরা যখন মজা করে একটা কথা বলি তখন সেটা বইয়ের ভাষার মত ব্যাকরণ মেনে চলে না। কিংবা আমরা ফেইসবুকেও যখন মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য চালাই তখন সেখানে আঞ্চলিকতা, বিকৃতি, শব্দবিন্যাসে পরিবর্তন সবকিছুই থাকে। আমার কাজিন বাছির এস.এস.সি. তে খুব ভাল রেজাল্ট করে স্কুল থেকে গ্রামের মেঠোপথ ধরে বাসায় যাচ্ছে রিকশায় করে। তো তার ভাল রেজাল্টের কথা সবাই ততক্ষণে জেনে গেছে। দূরে তার কিছু বন্ধু দলবেঁধে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল। একজন মজা করে চিৎকার করে উঠল, ‘কীরে বাছির, ভালা রেজাল্ট কইরা তো অক্করে রিশ্‌কা দা হাডছ…।’ এখন এই বাক্যটা অনুবাদ করে বিদেশী কাউকে বোঝানো কতটা কষ্টকর হবে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। সেদিন যেমন ল্যাবে আমি আর প্যাটি কাজ করছি। স্টিভ দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় চট করে কিছু একটা বলে গেল। আমি না বুঝেই মুচকি হাসলাম। পরে প্যাটিকে জিজ্ঞেস করলাম স্টিভ কি বলে গেল? প্যাটি হেসে বলল, ডৌন্ট ওয়ার্ক টূ হার্ড। মানে কাজ করতে করতে শহীদ হয়ে যাইও না আরকি। প্রথমত, স্টিভ বের হয়ে যাওয়ার সময় দরজার ঐদিক থেকে আমি কোন কথাই আশা করি নাই যে কান খাড়া করে রাখব। তার উপর সে কথাও বলে অর্ধেক মুখের ভিতর রেখে, খুব সামান্যই ঠোঁট নড়ে! তবে বুঝতে পারলে হয়ত সাথে সাথে প্রত্যুত্তরে বলা যেত- আরে মিয়া তোমাকে দেখেই তো আমরা কাজ করা শিখি বা এই জাতীয় কিছু। আর একথা বলাই বাহুল্য যে কৌতুক বা মজার কোন কথা সাথে সাথে ধরতে না পারলে বা উত্তর দিতে না পারলে আপনি বন্ধুদের মাঝে ‘সেন্স অব হিউমার কম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যেতে পারেন!

পুরো আমেরিকা জুড়ে নাকি ইংরেজীতে অনেক রকম আঞ্চলিক টান। সেটাই স্বাভাবিক, এত বড় দেশ। আমাদের ছোট দেশটাতেই তো কত রকম আঞ্চলিক ভাষা। শুনেছি আলাবামার ঐদিকের লোকদের কথা বোঝা নাকি খুবই কষ্টকর। আমার এক প্রফেসর আছেন, উনি ক্লাসে অনেক কৌতুক করেন, ব্যবহার করেন প্রচুর স্ল্যাং। অন্যান্য প্রফেসরদের দরজায় যেমন বিভিন্ন রিসার্চের গ্রাফ বা ছবি লাগানো থাকে, সেখানে উনার দরজায় লাগানো কমিক্‌স বইয়ের রঙ্গিন পাতা! প্রথমদিন উনার রুমে গিয়ে বেশ অবাক হয়েছিলাম! বুঝতে পারি উনার ঝুলিতে অনেক গল্প, তবে দুঃখের বিষয় ক্লাসে তার অনেক কথাই ধরতে পারিনা!

সুখের ব্যাপার হল চাইনিজদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। আমার মনে হয় তাদের ভাষাটা এত কড়া যে ওরা সেটা থেকে আর বের হতে পারেনা। তাই ইংরেজী বললেও ওটা হয়ে যায় চাইনিজ সুরে। অনেক বছর ধরে আমেরিকায় থেকেও তাই তাদের তেমন উন্নতি হয় না। অ্যারাবিয়ানরা ত ত করে সবকিছুতে। সবকিছু বিচার করে আমরাই ভাল আছি আসলে। বাংলা স্বরবর্ণ এত শক্তিশালী যে আমরা চাইলে প্রায় সবধরণের উচ্চারণই করতে পারি। বাঙ্গালিরা বা ভারতীয়রা এখানে আসামাত্রই খুব দ্রূত ইংরেজী বলছে দেখলে অনেকেই প্রশ্ন করে, তোমরা মাত্র এসেছ অথচ এত ভাল ইংরেজী বলছ কী করে! তাদের ধারণা এখানে সবাই এসে থাকতে থাকতে ইংরেজী শেখে। আমাকেও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে অনেকবার। তখন আমি ব্যাখ্যা করে বলি যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গোড়া থেকেই গ্রামারসহ বাধ্যতামূলক ইংরেজী শিখতে হয়। তাছাড়া ব্রিটিশরা দুইশ বছর শাসন করাতে আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যেও ইংরেজীর প্রচলন ভালই ছিল।

যারা ইংল্যান্ডের মানুষদের ইংরেজী শুনেছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে তা আমেরিকান ইংরেজীর চেয়ে একটু অন্যরকম। সেখানে আবার লিভারপুলের ইংরেজী এতই বিকৃত যে অন্যান্য ইংলিশদেরও নাকি বুঝতে সমস্যা হয়। শেষ করি একটা মজার ঘটনা (যদিও অফটপিক) দিয়ে। ইংল্যান্ডে যেদিন ক্লাব ফুটবলের ম্যাচগুলো থাকে সেদিন খেলা শেষে আশেপাশে অনেক ভাংচুর হয়। লাঠিসোটা নিয়ে হামলাও হয় প্রতিপক্ষের উপর। ডার্বি ম্যাচের আগে একই পরিবারে যদি বাবা-মা দুই দলের সমর্থক হন, তাহলে সকাল থেকেই নাকি তাদের মধ্যে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় (রেফারেন্সঃ আরশাদ ভাই)! কখনো কখনো দলবেঁধে স্টেশনে ওঁত পেতে থাকে- ট্রেন থেকে নামামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিজিটিং ফ্যানদের উপর। এটাতো জানা কথাই যে ইংল্যান্ডের ফুটবল ফ্যানরা তাদের আমজনতার মত ভদ্র না। তো সিফাত আপু তখন ম্যানচেস্টারে থাকতেন। একদিন খেলাশেষে উনি কি কাজে যেন রাস্তায় বের হয়েছেন। হঠাৎ একদল উন্মত্ত সমর্থক লাঠিসোটা নিয়ে ঘিরে ধরল তাকে। জানতে চায় উনি কোন দলের সমর্থক। একেতো এরা কোন দল সেটা উনি বুঝতে পারছেন না তার উপর ক্লাব ফুটবলের উপর তার তেমন কোন ধারণা বা আগ্রহ নেই। তবে নিশ্চিতভাবেই ভুল উত্তর দিলে কপালে খারাবি আছে। উনি বুদ্ধি করে এমন একটা ভান করলেন যে এরা কী বলছে কিছুই বুঝতে পারছেন না। আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েও দিলেন যে উনি ইংরেজী একেবারেই বোঝেন না, সবেমাত্র ইংল্যান্ডে এসেছেন। সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন হুলিগানদের হাত থেকে। ইংল্যান্ডে যারা আছেন বিপদে পড়লে এই টেকনিক ট্রাই করে দেখতে পারেন।

(চলবে)

Advertisements