(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)


লাইভ কনসার্টের প্রতি আকর্ষণ সবসময়ই ছিল; তবে ঢাকায় আসার আগে সে সুযোগ কখনো হয়নি। বুয়েটের কল্যানে প্রথম দু’বছরেই এলআরবি, মাইলস্‌, ওয়ারফেজ, আর্টসেল, শিরোনামহীনসহ আরও কিছু ছোটখাট ব্যান্ডের কনসার্ট দেখা হয়ে যায়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে সারাদেশে কনসার্ট বন্ধ করে দিলে বুয়েটেও খরা চলতে থাকে।

পহেলা বৈশাখে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান কখনো মিস করতাম না। তারা দেশের বিখ্যাত কিছু বাউল নিয়ে আসত ঐ রাতে। সারাজীবনই টিভিতে বাউল গান দেখলে চ্যানেল পালটে দিয়েছি। কখনো ভাবিনি সরাসরি দেখতে এত ভাল লাগবে! আর ঐ অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে গান গাইত শিরোনামহীন। নিজের ডিপার্টমেন্ট বলে ব্যান্ডের ভোকাল প্রিয় তুহীন ভাইকে আমরা পেতাম আরও আপন করে। জেমস্‌কে বুয়েটে না পেলেও কনসার্ট মিস হয়নি। একবার সানরাইজ থেকে কোচিং করে মিরপুরে বাসায় যাওয়ার পথে দেখি রাস্তায় অনেক ভীড়। শুনি জেমস্‌ আসবে! ওটাই ছিল ঢাকায় প্রথম কনসার্ট, তাও আবার প্রিয় গায়ক জেমস্‌! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এত এত ব্যান্ডের কনসার্ট দেখার পরও আমি বলব জেমস্‌ই সেরা। তার মত কনসার্ট আর কেউ মাতাতে পারে না। আর একবার জেমস্‌কে পেলাম আদনান সামীর কনসার্টে। কাজিন সাত্তার ভাইকে এই ফাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি- ঐ আমলে পাঁচশ টাকা করে টিকেট কেটে আমাকে আর শান্তকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আদনান সামী তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। একটা পর একটা ভাল গান উপহার দিয়েই যাচ্ছে। তো তার আসার আগে জেমস্‌ গাইল সাত/আটটা গান এবং যথারীতি মাতিয়ে দিয়ে গেল। এরপর আদনান সামী হাজার রকমের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির। সেগুলো প্রায় দুই ঘন্টা ধরে টিউন করা হল। অনেকগুলো গান গাইল সেদিন, স্থূল শরীর নিয়ে কিছুক্ষণ নাচারও চেষ্টা করল। তবে লোকটা জিনিয়াস, কীবোর্ডে যে এশিয়ার দ্রুততম তা প্রমাণ করে ছাড়ল! আরেকটা পার্থক্য টের পেলাম তখনই যে এরা লাইভ কনসার্টেও মূল মিউজিকটা দেয়ার শতভাগ চেষ্টা করে যেটা কীনা দেশের ব্যান্ডগুলোর মাঝে পাইনি।

ফ্লোরিডাতে আসার কয়েকমাস পরেই শুনি শাকিরা নর্থ আমেরিকা ট্যুরে বের হচ্ছে। বিশ্বকাপে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গেয়ে তখন সে ব্যাপক ফর্মে। চারিদিক থেকে আওয়াজ আসছেঃ ‘একদিকে শাকিরা, অন্যদিকে বাকিরা’। আমেরিকায় কেউ নতুন অ্যালবাম বের করলে সাধারণত সেটার প্রচারণার জন্য ট্যুরে বের হয়। প্রায়ই তা শুরু হয় সর্বদক্ষিণের স্টেট ফ্লোরিডা দিয়ে। আর ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে মায়ামী বা অরল্যান্ডোর জনপ্রিয়তা তো আছেই। তো অরল্যান্ডোতে বাড়ির এত কাছে এসে শাকিরা গেয়ে যাবে আর আমি যাবনা তা কী করে হয়! মাইনুল ভাই আর আমি একসাথে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। দুইজন মিলে টিকেট কেটে রাখলাম তিনমাস আগেই! পরের দিকে ঐ টিকেটের দাম বেড়ে গিয়েছিল অন্তত পাঁচগুণ! যাই হোক, কনসার্টের দুইদিন আগে মাইনুল ভাই মন খারাপ করে জানালেন যে উনি যেতে পারছেন না। ল্যাবের কোন কাজ পরে গিয়েছিল বোধহয়। তবে উনি টিকেট দিয়ে দিলেন আমাকে যেন আমার একা যেতে না হয়। বলে কয়ে রাজী করলাম আরেফীন ভাইকে। শাকিরার ফ্যান না হওয়ায় প্রথমে উনি যেতে চাচ্ছিলেন না! আমি যুক্তি দেখালাম, ‘ভাই তার গান না শুনলেন; তারে চাক্ষুস দেখতে তো যাইতে পারেন’। এবার আরেফীন ভাই তার নাইকন ক্যামেরা নিয়ে বের হলেন আমার সাথে।

গিয়ে দেখি চারিদিকে সব হিস্প্যানিক মানুষজন। আমাদের বাদামী চামড়া দেখে অনেকেই ভাবছে আমরাও হিস্প্যানিক! চমকে উঠলাম যখন গেটে টিকেট চেকারও আমাদের সাথে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে উঠল! কনসার্ট ছিল ইনডোরে। ভেতরে একজনও সাদা চামড়ার আমেরিকান নেই! পরে বুঝলাম, শাকিরা আন্তর্জাতিকভাবে অনেক জনপ্রিয় হলেও; আমেরিকায় প্রধানত হিস্প্যানিকরাই তার গানের শ্রোতা। সত্যি বলতে কী ওখানে আমাদেরকে বহিরাগত মনে হচ্ছিল, আর শাকিরাকে মনে হচ্ছিল তাদের নিজেদের কেউ! মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, যেহেতু তার বেশিরভাগ গানেরই ইংরেজী-স্প্যানিশ দুইটা ভার্সনই থাকে; তাই আজ তার ইংরেজীতে গান গাওয়া তো দূরের কথা, কথা বলারও কোন সম্ভাবনা নেই। সন্দেহ আংশিক সত্য হল- কিছু গান স্প্যানিশেই গাইল। তবে বিখ্যাত গানগুলো ইংরেজীতে। আমাদেরকে ধন্য করে দিয়ে কথাও বলছিল বেশিরভাগই ইংরেজীতে। আমরাও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম- এইটা আমেরিকা; তার দেশ কলম্বিয়া তো আর না…

সময় নষ্ট না করে শাকিরা খুব দ্রুত একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছিল। তাড়াহুড়ার কারণ সহজেই অনুমেয়- দুইমাস ধরে প্রতি দুইদিনে একটা করে কনসার্ট করতে হলে প্রফেশনাল হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে গান-মিউজিক-নাচ কোনকিছুর মানই একবিন্দু কমে যায়নি। প্রতিটা গানের সময়ই শাকিরা নাচছিল মূল মিউজিক ভিডিওর অনুকরণে। এমনকি জামাও পালটে যাচ্ছিল সে অনুযায়ী। সেদিন আমরা বসেছিলাম স্টেজ থেকে অনেক দূরে। গান শোনার ঝামেলা (!) না থাকায় আরেফীন ভাই মনের সুখে তার শক্তিশালী ক্যামেরা দিয়ে জুম করে ছবি তুলে যাচ্ছিলেন। আগ্রহী পাঠকগণ চাইলে ছবি বা ভিডিও দেখতে পারেন।

(চলবে)

Advertisements