(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)


শাকিরা কনসার্টের পর তক্কে তক্কে রইলাম যদি আর কোনো আর্টিস্ট ফ্লোরিডাতে আসে…দুইমাস পরই লিঙ্কিন পার্ক ঘোষণা করল তারা ট্যুরে বের হচ্ছে। ফ্লোরিডাতে দুইটা কনসার্ট করবেঃ একটা মায়ামীর কাছে, আরেকটা টাম্পাতে। টাম্পা আমার কাছাকাছি হলেও দুই ঘন্টার ড্রাইভ। আর এখানে দুই ঘন্টা ড্রাইভ মানে প্রায় একশ মাইল! আশেপাশে বন্ধুদের বললাম; কিন্তু কেউ আগ্রহী না। ঠিক করলাম বাসে যাব, তবে সেক্ষেত্রে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দুই বাসে যাওয়া গেলেও কনসার্ট শেষে এত রাতে ফিরতি বাস থাকবে না। ছয়ঘন্টা বাস স্টেশনে বসে ভোরে অরল্যান্ডো আসাটাও কষ্টকর। বলে রাখি, এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশান সিস্টেম জঘন্য। নিজের গাড়ি না থাকলে তাই কার্যত গৃহবন্দিই থাকতে হয়!

যা হয় হবে ভেবে একাই টিকেট কেটে ফেললাম অনলাইনে। তার আগে অবশ্য তুরেন ভাই আর রেজাকে পটানোর চেষ্টা করলাম। আসলে একা একা যেতে কেমন যেন লাগছিল। তুরেন ভাই অফিসের কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত। আর রেজা লিঙ্কিন পার্কের ভয়াবহ ফ্যান হওয়া সত্ত্বেও আসতে রাজি হলনা দূরত্বের কারণে। ও থাকে টাম্পা থেকে আরও দূরে বোকা রেটনে, প্রায় চার ঘন্টার ড্রাইভ। এতগুলো ডলার খরচ করে টিকেট করলাম, কিন্তু আমি নিজেও নিশ্চিত না একমাস পর ঐদিন আমি ফ্রি থাকব কীনা। এখানে গ্র্যাডলাইফ খুব কঠিন, বিশেষ করে কেউ যখন প্রফেসরের সাথে রিসার্চ করে। কখন প্রফেসর কী চেয়ে বসবে কেউ জানে না। হঠাৎ করেই ঘাড়ের উপর একগাদা কাজ চলে আসে, আর তার সাথে ডেডলাইন তো আছেই…

চিন্তা করলাম যেভাবেই হোক রাইড ম্যানেজ করতে হবে। অরল্যান্ডোতে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে যে কীনা লিঙ্কিন পার্কের কনসার্টে যাচ্ছে। ফেইসবুকে মানুষের স্ট্যাটাস সার্চ দিতে লাগলাম। প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে পাই যে টাম্পার ওই কনসার্টে যাবে বলে আনন্দ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। এভাবে ফেইসবুক, টুইটারে অপরিচিত কিছু মানুষ পেলাম যারা অরল্যান্ডো থেকে ঐ কনসার্টে যাবে। মেসেজ পাঠিয়ে উত্তরও পেলাম। আমার অফার ছিল এরকম যে আমাকে রাইড দিলে আমি গাড়ির ফুয়েল খরচ বহন করব। তবে কেউ কনফার্ম করতে পারছিল না। বেশিরভাগই দলবল নিয়ে যাচ্ছে, গাড়িতে জায়গা নেই। কেউ কেউ আবার আমার বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। হঠাৎ তখন মাথায় আসল রাব্বী ভাই টাম্পায় থাকে। এটা একটা মজার ব্যাপার- আমেরিকার যেখানেই তাকাই বুয়েটিয়ান পেয়ে যাই! রাব্বী ভাই আমার ফোন পেয়ে খুব খুশি হয়ে বললেন, কনসার্ট শেষে সোজা তার বাসায় গিয়ে উঠতে।

হঠাৎ একদিন শুনি আমার কলিগ ম্যাট্‌ তার গার্লফ্রেন্ড ম্যারি আর নিজের জন্য টিকেট কেটেছে। ম্যারি নাকি লিঙ্কিন পার্কের ভীষণ ফ্যান। তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে আগে একটা ভার্সিটির ফুটবল ম্যাচে, স্টেডিয়ামে বসে ওদের সাথে খেলা দেখেছিলাম। তাদের ব্যাপারে মজার কিছু তথ্য দিয়ে রাখি এখানে। প্রতিমাসেই তারা ফেইসবুকে একবার করে ‘সিঙ্গেল’ হয় আর একবার করে ‘ইন এ রিলেশানশিপ’ এ যায়। মাঝে মাঝে রেগেমেগে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকেও বাদ দিয়ে দেয় নিজেদের। আবার কয়দিন পর জোড়া লাগে। ম্যাটের সাথে আমার বেশ ভাল খাতির, তার কারণ সেও আমার মত ফুটবল (সকার) ভক্ত! আমেরিকানদের মধ্যে ফুটবল পছন্দ করে এমন খুব কমই পাই। একদিন সে এসে বলে, ‘তুমিতো জান আমি কনসার্টের দুইটা টিকেট কিনছি। কিন্তু আমাদের ব্রেক-আপ হয়ে গেছে। এখন ম্যারিকে টিকেটগুলা কি গিফ্‌ট দিয়ে দিব, নাকি ওর কাছে সেল করব, নাকি তোমার কাছে সেল করে দিব বুঝতেছি না।’ তখনো আমি টিকেট কাটিনি, আর ম্যাট্‌ জানে যে আমি পেলে কিনে ফেলব। মনে মনে বলি, ‘আমারে দে ব্যাটা, ম্যারিকে নিয়ে আমি যাই’ (একটা তথ্য এখানে দেয়া জরুরী, ম্যারির মত এত সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে কখনো দেখি নাই! খুব হাসিখুশি, বেশ লম্বা, চোখ-চুল-হাসি সবই তার নিখুঁত সুন্দর! তাকে দেখলে যেকোন ছেলেরই বুকে ব্যথামতন লাগার কথা…)। হেসে বললাম, ‘তার জন্য নিয়ত করে কিনছ, তাকে উপহারই দিয়ে দাও…ব্রেক-আপ হইছে তো কী হইছে…’

পরে প্ল্যান চেঞ্জ হল। কারণ তারা আবার ‘ইন এ রিলেশানশিপ’। ম্যাট্‌ জানাল সে ড্রাইভ করে যাবে। আমি বললাম আমি বাসে যাচ্ছি, অথবা কারো রাইড পেলে ফুয়েল খরচ দিতে রাজি আছি। আমি বারবার খরচের কথাটা আনছি তার কারণ আমেরিকানরা টাকা-পয়সার ব্যাপারে খুব খোলামেলা আলোচনা করতে পছন্দ করে। ম্যাট্‌ যে এক পর্যায়ে ম্যারির কাছে টিকেট বিক্রি করতে চেয়েছিল সেটাই তার প্রমাণ। অর্থসংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের কোন রাখঢাক নেই। ম্যাট্‌ জানালো, আমি চাইলে তাদের সাথে যেতে পারি। আমি হেসে বললাম, তোমরা দু’জন একসাথে যাচ্ছ…আমি তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে রোমান্টিক ট্রিপটা নষ্ট করতে চাই না। পরের দিন ম্যারি আমাকে মেসেজ পাঠালো যে আমি গেলে তারা খুবই খুশি হবে এবং না গেলেই বরং মাইন্ড করবে। এইবার আমি বেশ স্বস্তি বোধ করলাম। ঠিক হল তাদের সাথেই যাব। রাব্বী ভাইকে বলে দিলাম যে আমি আর রাতে টাম্পাতে থাকছি না, কনসার্ট শেষেই ফিরে আসব। এরপর থেকে আমি দোয়া করতে থাকি যেন কনসার্টের দিন পর্যন্ত তারা ‘ইন এ রিলেশানশিপ’ এ থাকে। নতুবা আমার যাওয়া আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে…

সৌভাগ্যক্রমে কনসার্টের দিন তেমন কোন কাজ পড়েনি। ম্যাট্‌ আমাকে বাসা থেকে তুলে নিল, তারপর গেলাম ম্যারির বাসায়। ও তখনো রেডী হচ্ছে। আমরা ড্রয়িং রুমে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যে তথ্যটা শুনে টাশ্‌কি খেলাম তা হল ম্যারির সাথে রুম শেয়ার করে একটা ছেলে। কিন্তু ও ‘গে’, তাই তার সাথে শেয়ার করতে নীতিগতভাবে কোন সমস্যা নেই। অন্তত ম্যাটের নেই! আমাদের দেশে এক ধর্মের একটা মেয়ে যেমন অন্য ধর্মের একটা ছেলের সাথে সাবলীলভাবে চলাফেরা করে, এই ব্যাপারটাকে তারই ভিন্ন রূপ বলে মনে হল…

আমার নিউইয়র্কে থাকা বন্ধু রিফাত বলেছিল স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটতে আর একটু আগে আগে যেতে। তাতে নাকি আমি স্টেজের কাছাকাছি থাকব। তার কথা শুনেই স্ট্যান্ডিং টিকেট কেটেছি। ম্যারি আর ম্যাট্‌ অবশ্য গ্যালারিতে। একঘন্টা আগেই পৌঁছে গেলাম। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি মানুষজন তেমন নেই! তখন সবাই মাত্র আসতে শুরু করেছে। ম্যারি সাবধান করে দিল যে স্টেজের কাছে অনেক ক্রেজী দর্শক থাকে। আমি নিরাপদ দূরত্বে থাকব কথা দিয়ে একদৌঁড়ে চলে গেলাম স্টেজের একেবারে সামনে। আমার সামনে মাত্র তিনটা লাইন, মানে তিনটা মাথা! বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এত কাছ থেকে লিঙ্কিন পার্কের পারফরম্যান্স দেখব, তাও আবার ইনডোরে! একসময় এই ব্যান্ডের প্রায় সবগুলো গানের লাইভ পারফরম্যান্সের ভিডিওতে কম্পিউটার ভর্তি ছিল…যারা আমার কম্পিউটার দেখেছে তারা নিশ্চয়ই জানে যে মূল গানের চেয়ে লাইভটার ভিডিওই বেশি ছিল আমার সংগ্রহশালায়।

প্রথমে ছোটখাট দু’টো ব্যান্ড গান গাইলো। রাত সাড়ে আটটার দিকে অনেক আয়োজন করে মঞ্চে প্রবেশ করল প্রথমে মিঃ হানলোকটা অনেক মোটা হয়ে গেছে। তারপর অন্য সদস্যরা, সবার শেষে মাইক শিনোডা আর চেস্টার বেনিংটন– দুই জনপ্রিয় ভোকাল। একসময় হয়ত দলের মূল ভোকাল ছিল চেস্টারই। তবে মাঝখানে দুইজনই পৃথক পৃথক হয়ে কাজ করায় এখন মাইক শিনোডার ভক্তকূলও বিশাল। তাই দু’জন একসাথে এখনো গান গায়- এটা একটা বিশাল ব্যাপার! আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম চারিদিকে সব ডাই হার্ড ফ্যানগুলা। প্রতিটি গানের প্রতিটি র‍্যাপই তাদের মুখস্থ আর সমানে গেয়ে যাচ্ছিল। তবে এই জাতি বেশ ভদ্র জাতি। আমার পেছনে যারা ছিল, আমাকে টপকে সামনে যাওয়ার প্রবণতা কারো মাঝেই দেখিনি। শাকিরা কনসার্টে সব দর্শক ছিল হিস্‌প্যানিক। কিন্তু এখানে মোটামুটি সবাই সাদা চামড়ার আমেরিকান। কিছু এশিয়ানও দেখেছি। হঠাৎ আমার পেছন থেকে এক ছেলে হাসিমুখে এসে আমাকে আর আমার পাশেরজনকে চুইংগাম দেয়া শুরু করল- আরে খাও। আমরা আমরাই তো, সবাই আমরা লিঙ্কিন পার্কের ফ্যান। চুইংগাম নেয়ার পরে বলে, ‘এখন কি আমি তোমাদের সামনে যেতে পারি? আমি একটু বেশি কড়া ফ্যান, তাই একেবারে সামনে গিয়ে হেড ব্যাং না করলে পোষাচ্ছে না।’ তার অমায়িক ব্যবহার আর কৌশলে মুগ্ধ হয়ে আমরা তাকে হাসতে হাসতে বললাম, ঠিক আছে যাও যাও…

একে একে প্রায় আঠারোটা গান গাইল তারা। র‍্যাপ আর রকের এত চমৎকার কম্বিনেশান আর কেউ করতে পারে না। চেস্টার তার পাতলা শরীর নিয়ে স্টেজের এপাশ থেকে ওপাশে বিশাল বিশাল জাম্প দিয়ে যাচ্ছিল। মাইক বলে, চেস্টার নাকি নিজের বাসায় সারাদিনই এই জাম্প দেয়া প্র্যাকটিস করে আর এভাবে অনেকবারই হাত ভেঙ্গেছে! আমি আগের পর্বে বলেছি যে এরা কনসার্টে গানের কোয়ালিটি বা সুর পরিবর্তন করে না। এবারও তার প্রমাণ পেলাম। মনে হচ্ছিল মূল গানটাই প্লে করছে। আমি অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে একটা কনসার্টে চেস্টার যে পরিমাণ পরিশ্রম করছে, এভাবে পুরো নর্থ আমেরিকা ট্যুর কিভাবে দিবে! পরে খবর পেয়েছি কয়েকটা স্টেট কভার করার পর আসলেই চেস্টার অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং অবশিষ্ট ট্যুরগুলো বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে…

কনসার্ট শেষে বাইরে এসে যখন ওদের সাথে দেখা করলাম, ওরা বারবার বলছিল রিজ (এখানে আমেরিকানরা আমাকে এই নামেই ডাকে), তুমি কত কাছে ছিলা। আমরা জানলে আমরাও স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটতাম। বিশেষ করে ম্যারি, মাইক শিনোডা বলতে সে অজ্ঞান। আমাকে জিজ্ঞেস করল একেবারে শেষে মাইক যখন পানি ছিটাচ্ছিল আমার উপর পড়েছে কীনা। আমি আমার জ্যাকেটের কাঁধে দেখালাম, এই যে পানির ফোঁটা। পাগল মেয়েটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল- যেন মাইক শিনোডার কাছ থেকে কিছু একটা তার কাছে বয়ে এসেছে…

বিঃদ্রঃ আগ্রহী পাঠকগণ চাইলে ছবি বা ভিডিও দেখতে পারেন।

(চলবে)

Advertisements