(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)



দেখতে দেখতে আবার সামার চলে আসলো। সামারে পুরো ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। আন্ডারগ্র্যাডের স্টুডেন্টরা সাধারণত কোর্স নেয় না, ইন্টার্ন করতে এদিক সেদিক চলে যায়। অনেক প্রফেসরও পুরো সময়টাই বাইরে কাটায়। এসময় একপাল ছাত্র-ছাত্রী আসে, আর একজন গাইড তাদেরকে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। ক্যাম্পাস পছন্দ হলেই কেবল এই আমেরিকান স্টুডেন্টরা এখানে আসবে পড়তে! পরে বুঝলাম একারণেই এখানকার ভার্সিটি ক্যাম্পাসগুলো এত সুন্দর করে সাজানো, রীতিমতো ব্যবসা! একটা স্টুডেন্ট চিন্তা করে- গাঁটের পয়সা খরচ করে পড়তে আসব যা যা পারি সুবিধা নিয়ে নেই। তাই আসার আগে দেখে নেয় জিম-সুইমিং পুল কেমন, ক্যাফেটেরিয়ায় নামিদামি রেস্টুরেন্ট আছে কি না, লাইব্রেরি বা কম্পিউটার ল্যাব কতটা সমৃদ্ধ ইত্যাদি।

আমরা বিদেশী স্টুডেন্টরা প্রায় বিনা বেতনে পড়ি আর তার উপর ফান্ডিং পাই শুনলে আমেরিকানরা অবাক হয়ে যায়। এটা ওদের কাছে স্বপ্নের মত ব্যপার! ওদের মধ্যেও যে কেউ কেউ এরকম প্রফেসরদের সাথে রিসার্চ করে ফান্ডিং পায়না তা নয়; তবে আমার ভার্সিটিকে উদাহরণ হিসেবে নিলে, নব্বই ভাগই বিদেশী স্টুডেন্ট যারা ফান্ডিং পায়। আসলে প্রফেসররা আমাদেরকে স্বল্প বেতনে যতটা খাটিয়ে নিতে পারে আমেরিকানদেরকে ওটা কখনোই পারবে না। ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা বাজলেই তারা অফিস থেকে দৌড় দেয়। উইকেন্ডে কাজ করা তো দূরের কথা প্রফেসর কোন ইমেইল করলেই গজগজ করতে দেখেছি ওদের…

আমরা বিদেশী স্টুডেন্টরা চাইলেই এদিক সেদিক কাজ করে পয়সা রোজগার করতে পারি না। কেবল মাত্র রিসার্চ বা অ্যাকাডেমিক কোন কাজের শর্তেই আমাদেরকে আমেরিকায় ঢুকতে দেয়া হয়। তবে এদেশীয় স্টুডেন্টদের প্রত্যেকেই মোটামুটি কোথাও না কোথাও কাজ করে। টিউশন ফী দেয় লোন নিয়ে, শর্ত হলো পাস করার পর কোনভাবে শোধ করে দিবে। আমার এক বন্ধু আছে যার আয়ের উৎস শুনে বেশ আহত হয়েছিলাম। সে লোন নিয়ে টিউশন ফী দেয়, একটা রেস্টুরেন্টে পার্টটাইম কাজ করে, আমার প্রফেসরের সাথে সামান্য বেতনে রিসার্চের কাজ করে আর প্রতি দুইমাসে একবার নিজের রক্ত বিক্রি করে এবং এতে দুইশ ডলার করে পায়! শেষোক্ত উৎসটা আমি একেবারেই আশা করিনি!

সামার নিয়ে লিখতে বসেছিলাম, কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে বিষয়গুলো উঠে আসছে আমার লেখায়। দেখি রগরগে কিছু জিনিস নিয়ে লেখা যায় কীনাঃ গত সামারে এই সময়ে মায়ামী ছিলাম। ঝটিকা সফর বলা যেতে পারে, একরাত ছিলাম মাত্র। অরল্যান্ডো থেকে ছয়জন মিলে নারীবর্জিত (মায়ামী যাওয়ার পূর্বশর্ত) একটা দল গঠন করলাম। রেন্ট-এ-কার থেকে বেশ বড় একটা ভ্যান ভাড়া করলাম। ড্রাইভার কেবল আরেফীন ভাই; আমরা আর কেউ ড্রাইভিং পারিনা। সবাই বাসা থেকে খাবার দাবার নিয়ে নিলো, উদ্দেশ্য খরচ যতটা সম্ভব কমানো। দরিদ্র গ্র্যাড-স্টুডেন্ট বলে কথা…

প্রায় পাঁচঘন্টা পর মায়ামী ডাউনটাউনে প্রবেশ করলাম। কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না- রাস্তাঘাট, বিল্ডিং, মানুষের ভিড় ইত্যাদি দেখে যে কেউ বলবে এটা আমাদের ঢাকা শহর! আলমগীর ভাইয়ের পিচ্চি মেয়ে অরিনও নাকি এখানে এসে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছিলো- ‘আম্মু আমাকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসছো কেন?’ সস্তা টাইপ একটা হোটেলে উঠলাম আমরা, তবে বীচের একেবারে কাছে। জিনিসপত্র রেখেই দৌড়ে চলে গেলাম সাউথ বীচে। ছবিতে পানির রঙ দেখে সবসময় ভাবতাম ফটোশপে বুঝি এডিট করা। কিন্তু মায়ামী বীচের পানির রঙ আসলেই সবুজ! আর পানিতে নামার পর বুঝলাম কেন সবাই এখানে সারাদিন পরে থাকতে চায়- পানির তাপমাত্রা খুবই আরামদায়ক। যখন সৈকতে খুব গরম তখন পানি বেশ ঠান্ডা, আবার সকালবেলা এই পানিটাই হয়ে থাকে কুসুম গরম। 

প্রচুর ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্ট। সৈকতে সুন্দরীরা সানবাথে ব্যস্ত। আচ্ছা সানবাথের বাংলা কি? সূর্যস্নান? ঠিকাছে করুক সানবাথ, চামড়া কাগজের মত সাদা; পোড়ানো দরকার। আমাদের মধ্যে আরেফীন ভাইয়ের এটা দ্বিতীয় মায়ামী ভ্রমণ। তাই তার চোখ সয়ে গেছে; কিন্তু আমরা অত্যুৎসাহী ব্যাচেলর যুবকরা তখনো ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছি কিংবা একে অপরের ছবি তোলার ভান করছি। পাশেই সাগরের ঠান্ডা পানি থাকা সত্ত্বেও তাই প্রচন্ড গরমের মধ্যে সৈকত ধরেই হাঁটতে লাগলাম। এই হন্টন বৃথা যায়নি…

রাতে হোটেলে ফিরে সবাই শাওয়ার সেরে নিলাম। কোথাও খাওয়া দরকার। রান্না করে আনা মাংস আর চিংড়ী আছে, তবে ভাত দুপুরেই শেষ। বাইরে একটা ভারতীয় দোকান থেকে নানরুটি কিনে এনে কাজ চালানো হল। রাত একটার দিকে আবার বের হয়ে পড়লাম রাতের মায়ামী দেখব বলে। ফরহাদ ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ায় হোটেল থেকে আর বের হলেন না। চারিদিকে বেশ আলোকসজ্জা, অনেক মানুষ রাস্তায়, দামি সব গাড়ী পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। একদিকে একটা জটলা মত দেখে আমি এগিয়ে গেলাম। বিশালদেহী এক লোককে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সাথে সাথেই চিনে ফেললাম- কিংবদন্তী রেসলার হাল্ক হোগান! যারা রেসলিং দেখেন না তারা টিভি সিরিজ ‘থান্ডার ইন প্যারাডাইজ’ সূত্রেও তাকে চিনে থাকতে পারেন। রেসলিং এর কড়া ফ্যান হিসেবে মায়ামী আসাটাকে সার্থক মনে হল। সাথে সাথে তার একটা ছবি তুললাম। অন্যদের ডেকে আনতে গেলাম যেন আমার সাথে একটা ছবি তুলে দেয়; কিন্তু ততক্ষণে সে একটা রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে পরেছে।

স্থানীয়দের বেশিরভাগই হিস্প্যানিক অথবা কালো। সাদা চামড়ার মানুষ তেমন একটা দেখিনি ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্ট ছাড়া। চারিদিকে অনেক বার আর নাইটক্লাব। কয়েকটাতে বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখলাম- আধো আলো আর আধো অন্ধকারে নাচ-গান-অ্যালকোহল চলছে পুরোদমে। রাস্তায় মানুষজনের চাহনি পালটে গেছে এই কয়েকঘন্টার ব্যবধানেই। কড়া পারফিউম আর বেশ উগ্র সাজে মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে। আর আশেপাশের লোকগুলো লোভী দৃষ্টিতে তাদেরকে দেখছে। সবাই মোটামুটি মাতাল। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় অসাবধানতাবশতঃ একটা মেয়ের গায়ে হাত লাগলো আমার। তাড়াতাড়ি স্যরি বলে উঠলাম। মেয়েটা বেশ প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। এই হাসি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, নাথিং টু বি স্যরি হিয়ার ইন মায়ামী…পরে রাকিব ভাইরা এটা নিয়ে বেশ মজা করতেন…

রাত তিনটার দিকে আমরা আবার সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসে রইলাম। খুব সুন্দর বাতাস আর আকাশে চাঁদ ছিল। আমরা বালুকায় বসে গল্প করতে লাগলাম। ঠিক পেছনেই একঝাঁক নারীর কোলাহল শুনতে পাই। আমাদের দেখেই কি না জানি না তাদের কথাবার্তা আরও বেড়ে গেল। সবাই মাতাল বোঝাই যাচ্ছিল। আধঘন্টা বসার পর উঠে যেতে বাধ্য হলাম তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে, কোথায় একটু নিরিবিলিতে প্রকৃতি দর্শন করব!! কিন্তু আমাদেরকে উঠে যেতে দেখে তাদের একজন সাহস করে আমাদের কাছে চলেই আসল। বিশালাকৃতির এক নিগ্রো মেয়ে, আবছা আলোতে দেখলাম তার সঙ্গীরাও নিগ্রো। এসে বলে যে, আমরা চাইলেই খুব কম খরচে তার বান্ধবীদেরকে পেতে পারি। একথা শুনে ওয়ায়েস ভাই প্রথমেই এক দৌড়ে দূরে চলে গেলেন। অন্যরা সবাই বেশ থতমত খেয়ে গেছি। একারণেই এতক্ষণ আমাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওরা কথা বলছিল। মেয়েটা ভাবলো আমরা কেউ ইংরেজি বুঝিনা। আমরাও ইংরেজি বুঝিনা এরকম ভান করে আর নো থ্যাঙ্কস টাইপের একটা ভঙ্গি করে মোটামুটি পালিয়ে বাঁচলাম সে যাত্রায়…

পরদিন সাগর আর সৈকতে আরও কয়েকঘন্টা কাটালাম। মাঈনুল ভাইকে শতচেষ্টায়ও পানিতে নামানো গেলনা। সাঁতার জানেন না বলে সৈকতেই ঘোরাঘুরি (!) করে সময় পার করলেন। ফিরতি পথে একটা দাওয়াত পেয়ে গেলাম। ওয়ায়েস ভাইয়ের এক বন্ধুর বড়ভাই থাকেন ওয়েস্ট পাম বীচে। গিয়ে দেখি আমাদের জন্য দুপুরে বিশাল খাবার দাবারের আয়োজন করে রেখেছেন উনি। মুশফিক ভাই বুয়েটের। তাই আমাদেরকে পেয়ে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে লাগলেন। খাওয়া দাওয়ার পর আমাদেরকে আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখালেন। অনেক বাঙালি থাকে ওখানে। ওয়েস্ট পাম বীচেও কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলাম। এই বীচটা একটু অন্যরকম, প্রাইভেট টাইপের। চারিদিকে ঘের দেওয়া, পরিবার নিয়ে সারাদিন কাটানোর জন্য বেশ ভাল জায়গা। বিকেলে মুশফিক ভাই আবার আমাদেরকে স্থানীয় একটা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে লাচ্ছি-মিষ্টি এগুলো খাওয়ালেন। আমাদের কাউকেই উনি চেনেন না। তারপরেও আমাদেরকে পেয়ে যে উনি মন থেকেই খুশি হয়েছিলেন তা বেশ বোঝা যাচ্ছিলো।

বেঁচে থাকলে হয়তো আবার মায়ামী যাওয়া হবে। তবে প্রথমবারের এই অভিজ্ঞতা অনেকদিন মনে থাকবে সন্দেহ নেই… 

(চলবে)
Advertisements