(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

শেষ ব্লগটা লিখেছিলাম প্রায় দুই মাস আগে। মাঝখানে লেখার মত অনেক কিছুই ঘটেছে; কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে লেখা হয়ে ওঠেনি। থিসিস লেখা আর তার ডিফেন্স নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বটে, তবে সেটাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাবো না। সেদিন বুয়েটের এক জুনিয়রের (জয়) সাথে কথা হচ্ছিলো, একসময় সে বললো ভাইয়া আপনি আর ব্লগ লেখেন না কেন? আমি আর আমার বন্ধুরা আপনার ব্লগের জন্য অপেক্ষা করে থাকি। আমি বললাম, বলো কী! আমিতো ধরে-বেঁধে ফেইসবুকের বন্ধুদের আমার ব্লগ পড়াই…যাই হোক, ওর কথা শুনে ঠিক করলাম শীঘ্রই লিখতে হবে। গত দুই দিনব্যাপী রোডট্রিপটা নিয়েই লিখে ফেলি এখন; দেখা যাক ওভেন ফ্রেশ কিছু বের হয় কি না…

ট্যুরের মূল উদ্যোক্তা- মামুন ভাই, পেশায় ডেন্টিস্ট। শখের ফটোগ্রাফারও বটে, তাই ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। বাকি সবাই (তানভীর ভাই, ওয়ায়েস ভাই, অপু ভাই) গ্র্যাড স্টুডেন্ট। পাঁচজনের দল, মূল ড্রাইভারও মামুন ভাই। সাথে ব্যাকআপ ড্রাইভার তানভীর ভাই। রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়ি নিয়ে রেখেছিলাম আগের দিনই। ঠিক করা হল সমুদ্রপাড়ে গিয়ে সারাজীবনই তো সূর্যাস্ত দেখলাম; এইবার সূর্যোদয় দেখব। তাই শনিবার ভোর চারটার সময়ই বেড়িয়ে পড়লাম। রাত জেগে ইন্টারনেটে বসে থাকার কারণে এত সকালে ওঠার অভ্যাস নেই একদম। তাই সবারই ঘুম জড়ানো চোখ। তবে একটা চাপা উত্তেজনাও আছে, এত বড় রোডট্রিপে আমরা আগে কখনো যাই নি। প্ল্যান হচ্ছে সবচেয়ে কাছের বীচে গিয়ে সূর্যোদয় দেখা, তারপর আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে উত্তরে চলতে চলতে যতগুলো বীচ পাওয়া যায় সবগুলোতে নামা। মাঝখানে পড়বে ফ্লোরিডার রাজধানী ট্যালাহাসি, এই ফাঁকে রাজধানীটাও ঘুরে ফেলা যাবে। তবে না, সেখানেই আমরা থেমে যাব না। ফ্লোরিডা স্টেটটা যেমন ধীরে ধীরে পশ্চিমে বেঁকে গিয়েছে, আমরাও দিক পরিবর্তন করে পশ্চিমে চলে যাব, যেন গালফ্ অব মেক্সিকো’র সৈকতগুলোতেও নামতে পারি। এক রোডট্রিপে আটলান্টিক আর গালফ্ অব মেক্সিকো দুটোই দেখা হয়ে যাবে। আর সবশেষে পশ্চিমের প্রায় শেষ প্রান্ত পেনসাকোলা বীচের কাছে কোন এক হোটেলে গিয়ে উঠব, সেটাই হবে আমাদের রোডট্রিপের সর্বশেষ পয়েন্ট। শুনেছি ওখানে বেশ বড় একটা বন্দরও আছে।

এখানে ভোর হয় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। হিসেব করে দেখলাম সূর্যোদয় দেখতে হলে ডেটোনা বীচে নামা উচিৎ আমাদের। আগেও এখানে এসেছি বেশ কয়েকবার জাহাঙ্গীর ভাই আর আমার বন্ধু মামুনের সাথে। বালি বেশ শক্ত হওয়ার কারণে এই সৈকতে গাড়ি বা অন্যান্য মোটরযান দেখা যায় প্রচুর। আর বীচের কাছেই রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত নাস্‌কার এর মোটরস্পোর্টস রেসিং ট্র্যাক। তবে সেদিন এত ভোরে মানুষজন ছিল না বললেই চলে। চারিদিক খুব শান্ত আর আরামদায়ক ঠান্ডা একটা বাতাস। আমি কিছুক্ষণ পাড় বরাবর দৌড়ে নিলাম ঘুম দূর করার জন্য। গ্রুপের কেউ কেউ সাগর পাড়েই ফজর নামাজ পড়ে নিল। এরপর মামুন ভাই ক্যামেরার ট্রাইপড সেট করে ফেললেন বালির উপর- সূর্যোদয় কাভার করা এই ট্রিপের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোথায় যেন পড়েছি সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর সব প্রাণী অস্থির বোধ করে। সূর্যোদয়ের ব্যাপারে কি বিপরীত কিছু বলা আছে যে, যারা ভোর হওয়া দেখবে অদ্ভূত এক প্রশান্তি নিয়ে দিন শুরু করবে? শেষ কবে সূর্যোদয় দেখেছি মনে পড়ছে না, তবে সমুদ্রপাড়ের এই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। যাই হোক, প্রায় ঘন্টাখানেক থেকে সুন্দর সুন্দর কিছু ছবি তুলে আবার আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম।

(ডেটোনা বীচে মামুন ভাইয়ের তোলা সূর্যোদয়ের ছবি)

ফ্লোরিডাকে বলা হয় সানশাইন স্টেট। আমেরিকার উত্তরের বরফপড়া স্টেটগুলোর সাথে তুলনা করে এই নামটা পজিটিভ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই সূর্যের তীব্রতা এত বেশি যে চামড়া একেবারে পুড়ে যায়। দেশে কখনো সানগ্লাস ব্যবহার করতাম না। এখানে প্রথম প্রথম এসে যার সাথেই বের হতাম, দেখতাম চশমা পড়ে ছিল বা অ্যাম্নেই বের হয়েছে, কিন্তু বাইরে গিয়েই সানগ্লাস কোত্থেকে যেন বের করে ফেলেছে! মানে সবাই সাথে রাখে, তা না হলে এই তীব্র আলোতে চোখ ব্যথা করে। এই সূর্য বাংলাদেশের সূর্যের মত না। অতিবেগুণী রশ্মিও অনেক বেশি। ভাগ্যিস দেশ থেকে আমিও একটা পাওয়ারসমেত সানগ্লাস অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনেছি। মুখের চামড়া বাঁচানোর জন্য মাথায় ক্যাপও পড়তে হয়। একারণেই ফ্লোরিডাতে বড় হওয়া সাদা চামড়ার আমেরিকানরাও অতটা সাদা না; কিছুটা তামাটে। আর যারা সমুদ্রপাড়ে বড় হয় তাদের চামড়া একদম রোদেপোড়া লাল। যাক গে, পুরোনো অভ্যাসমত অফটপিকে চলে যাচ্ছি বোধহয়। আটটা বাজতেই যখন বাইরে গরম পড়ে গেল, একটা গ্রোসারীতে (পাবলিক্স) ঢুকে কুলার, বেশ কিছু বরফ, অনেকগুলো গেটোরেডের বোতল, পাউরুটি, কলা, ডোনাট ইত্যাদি কিনে নিলাম। সকালের নাস্তা পাবলিক্সের বাইরে একটা বেঞ্চিতে বসেই সেরে নিলাম।

দ্বিতীয় যে বীচে গাড়ি পার্ক করলাম তার নাম এক ধনকুবেরের নাম অনুযায়ী ফ্ল্যাগলার বীচ। তখনো মানুষজন বেশি নেই, আসতে শুরু করেছে কেবল। এরকম সপ্তাহান্তে আমেরিকানরা পরিবার নিয়ে সারাদিনের জন্য চলে আসে। সারাদিনব্যাপী রোদে চামড়া পোড়ায়, বাচ্চারা বালি দিয়ে খেলতে থাকে, আর সমুদ্রস্নান তো আছেই। দেখলাম কিছু মানুষ লম্বা লাঠির মত মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কী যেন খুঁজছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করার সুযোগ হলো না, অনুমান করে নিলাম বীচে মানুষের হাত থেকে পড়ে যাওয়া আংটি বা এরকম মূল্যবান কোনকিছু বোধহয় খুঁজছে। মনে মনে ভাবলাম, এ তো খড়ের গাঁদায় সূচ খোঁজার মতন ব্যাপার হয়ে গেলো!! এরপর আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে গাড়ি চলতেই লাগল, গাড়ি থেকে দুইপাশের দৃশ্যও বেশ সুন্দর। মেঘ বা পানির গভীরতার কারণে পানিতে বিভিন্ন রঙের শেড পড়ছে। গাড়ির ভিতরে আমাদের হৈ-হল্লা আর গাল-গল্পও চলছে সমানে। মামুন ভাই আমাদের চেয়ে বেশ সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আলাপ আলোচনায় মিশে যান একেবারে বন্ধুর মতই। একই রকম রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা ড্রাইভ করতে হয় বলে ড্রাইভারের সাথে সবসময়ই কথা বলতে হয় কারো না কারো। তা না হলে ড্রাইভারের ঘুমিয়ে পড়া বিচিত্র কিছু না। আমাদের গল্পে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি লাইফের নানা কাহিনী উঠে আসছিল। উঠে আসছিল সফল/ব্যর্থ প্রেমের কাহিনীও। একপর্যায়ে মুখ ফসকে অভিনেত্রী অপি করিমের প্রতি মামুন ভাইয়ের বিশেষ অনুরাগের কথা কী করে যেন বেরিয়ে পড়ল। তখন আর পায় কে, অপু ভাই একেবারে ছাই দিয়ে মাছ ধরার মতো করে মামুন ভাইকে ধরলেন। মামুন ভাই যখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত, বিয়ের উপযুক্ত পাত্র, সেই সময়ের সাথে অপি করিমের বুয়েট থেকে পাশ করার সময়ের কোন একটা যোগসূত্র বের করে ফেলা হল আর এ সংক্রান্ত নানা গল্পে মামুন ভাইকে নিয়ে আমরা মেতে উঠলাম। আর মামুন ভাইও বাঁচার জন্য বারবার বাইরের বিভিন্ন দৃশ্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন…

এরপর একে একে ম্যারিনল্যান্ড বীচ, ক্রিসেন্ট বীচ আর সেন্ট অগাস্টিন বীচ ঘুরে ফেললাম। আর পথে সুন্দর কোন জায়গা দেখলেই গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলে নিচ্ছিলাম। সেন্ট অগাস্টিনের কাছে একটা সাইনবোর্ড দেখে নামলাম যেখানে লেখা ১৫৬৫ সালে ৩০০ জন ফ্রেঞ্চ ফ্লোরিডা দখলের উদ্দেশ্যে ওখান দিয়ে আসছিল। স্প্যানিয়ার্ডরা উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তাদের সবাইকে ছুরি দিয়ে ওখানেই হত্যা করে। এরকম জায়গা দেখলে আর ইতিহাস শুনলে কেমন যেন একটা শিহরণ জাগে।

দুপুর দুইটার দিকে আমরা ঢুকে গেলাম ফ্লোরিডার রাজধানী ট্যালাহাসিতে। বেশ প্রাণবন্ত শহর, রাজধানী বলে হয়তো একটু বেশিই সুউচ্চ ভবন, সুরম্য গীর্জা আর ফুলের বাগান। দেশে থাকতে ভাবতাম পুরো আমেরিকাই বোধহয় নিউইয়র্কের মত। কিন্তু বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটি মূল শহর থেকে দূরে হওয়ায় অবস্থা অনেকটা মফস্বলের মত। সবাই রাত আটটা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে, দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায়। তাই আমরা যারা ঢাকায় থেকে অভ্যস্ত তাদের জন্য এখানকার রাতগুলো একটু ম্যাড়ম্যাড়েই বলা চলে। একারণেই বোধহয় ট্যালাহাসিতে ঢুকে সবার চঞ্চলতা একটু বেড়ে গেল, বুঝলাম সবাই থাকার জন্য এরকম জায়গাই আসলে বেশি পছন্দ করে। একটা রেস্টুরেন্টে (সাবওয়ে) ঢুকে সাব (ব্রেডের মধ্যে মাংস-শাকসবজি-সস ইত্যাদি দিয়ে তৈরি) খেয়ে নিলাম। এই ট্যুর দেয়ার পর মনে হল আমেরিকার রাস্তার পাশে একটু পরপর গড়ে ওঠা গ্যাস স্টেশন, রেস্টরুম, রেস্টুরেন্ট (সাবওয়ে, ম্যাকডোনাল্ডস্‌ চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে) ইত্যাদি যেন তৈরিই করা হয়েছে রোডট্রিপের জন্য।

(চলবে)

Advertisements