পর্ব-১ পর্ব-২ | পর্ব-৩ | পর্ব-৪ | পর্ব-৫ | পর্ব-৬ | পর্ব-৭ | পর্ব-৮ | পর্ব-৯ |

(মূল লেখাঃ বকলম ডট কম)

ফ্লোরিডার রাজধানী ট্যালাহাসি ছেড়ে জর্জিয়া আর আলাবামার পাশ ঘেঁষে যখন পেনসাকোলার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, তাকিয়ে দেখি ঘড়ির কাঁটা একঘন্টা পিছিয়ে গেছে! ঠাহর হল যে বাড়ি ছেড়ে প্রায় পাঁচশ মাইল দূরে চলে এসেছি। আসলে এখানে যানজট না থাকায় আর মসৃণ রাস্তার উপর ঘন্টায় প্রায় আশি মাইল বেগে গাড়ি চলার কারণে বোঝাই যায়না যে কখন এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ফেললাম! গাড়ি মামুন ভাই একাই ড্রাইভ করে চলেছেন। যদিও মাঝে মাঝে তানভীর ভাইকে চালাতে দেয়ার কথা; কিন্তু জানালেন উনি ক্লান্ত নন!

পেনসাকোলা বীচে যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। সৈকতটা বেশ ছোট, চারিদিকে ময়লা-আবর্জনার মত মরা জলজ গাছ পড়ে আছে। আমরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম- এত নাম শুনলাম; আর এই হল সেই পেনসাকোলা বীচ! দেখার মত বলতে আশেপাশে অনেক কাঁশফুল। ওগুলোর পাশেই বিভিন্ন পোজে সবাই ছবি তুলে নিলাম। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে, রাতে কোথাও থাকার জায়গা ঠিক করা দরকার। সাগরসংলগ্ন এলাকাতে অনেকগুলো নামিদামী হোটেল চোখে পড়ল। দেখেই বোঝা যায় বেশ বিলাসবহুল। আসলে ফ্লোরিডার মার্কেট বা হোটেলগুলোর মূল টার্গেট ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্টরা। চারপাশে এত বীচ আর ডিজনী ওয়ার্ল্ডের মত থিম পার্ক থাকার কারণে বছরের সবসময়ই এখানে ট্যুরিস্টদের ভিড় লেগে থাকে আর সেই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও চড়া দামে সবকিছু গছিয়ে দেয়। ওয়ায়েস ভাই একটা হোটেলে ঢুকে জেনে আসলেন যে মাত্র একরাতের জন্য একটা রুম নিলেই তাতে দু’শ ডলার বেরিয়ে যাবে! রাতে ঘুমাবো হয়ত ৫-৬ ঘন্টা, এর জন্য এত খরচ করতে মন সায় দিচ্ছিল না। একজন প্রস্তাব করল সমুদ্র সৈকতেই রাত কাটিয়ে দিলে কেমন হয়? পরক্ষণেই নাকচ হয়ে গেল, মাত্রই দেখে আসলাম অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে ওখানে মশাও বাড়ছে! অরল্যান্ডোতে ফোন করে মাঈনুল ভাইকে অনুরোধ করলাম ইন্টারনেটে দেখতে আশেপাশে সস্তা টাইপের কোন হোটেল আছে কি না। উনি বেশ কয়েকটা ফোন নম্বর দিলেন। আমি ফোন করে করে প্রতিটাতে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম রুম খালি আছে কি না বা খরচ কেমন। আবিষ্কার করলাম, রুম ভাড়া সমুদ্রপাড় থেকে হোটেলের দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক। সুতরাং দূরে গিয়ে কোন হোটেলে ওঠাই লাভজনক।

মোটামুটি আধঘন্টা ড্রাইভ করে যে হোটেলটা পেলাম সেটার খরচ আগেরগুলোর তুলণায় বেশ কমই- সত্তুর ডলার। খুশি হয়ে গাড়ি থেকে সবাই বের হচ্ছি, তখন মামুন ভাইয়ের মনে পড়ল যে ওরা আমাদের পাঁচজনকে একরুমে থাকতে দিবে না। বলবে একজনের জন্য আরেকটা রুম নিতে। আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন- মাত্র ছয় ঘন্টা ঘুমানোর জন্য এত ভাড়া দিব? ফন্দি করা হল পঞ্চম ব্যক্তি সবার সাথে ঢুকবে না; পরে স্থানীয় অতিথি দেখা করতে এসেছে এমন একটা ভাণ করে ঢুকবে। মামুন ভাই আশ্বাস দিলেন হোটেলগুলোতে এই কান্ড হরহামেশাই হয়। অপু ভাই গাড়িতে রয়ে গেলেন। উনি নিজের ইচ্ছায় রইলেন নাকি আমরা চাপিয়ে দিয়েছিলাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। আমরা চারজন আইডি দেখিয়ে রুম বুঝে নিলাম। পরে দেখা গেল রুমটাতে বাইরে দিয়েই যেতে হয়; এত লুকোচুরির কিছু নেই। ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বার্গার আর পানি নিয়ে একেবারে রুমে ঢুকে গেলাম যেন রাতে আর খাবারের জন্য নামতে না হয়। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর সুযোগ পেয়ে লাইন ধরে গোসলের ধুম পড়ল। অপু ভাইকে বেশ কয়েকবার আশ্বাস দেয়ার পরও উনি উশখুশ করতে লাগলেন। নিয়ম লঙ্ঘন করে রুমে পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে থাকাটাই এর কারণ। তার উপর একটা ভয় ছিল ওরা যদি রুম চেক করতে চলে আসে যে আমরা চারজনই উঠেছি কি না! একটু পরে রুমে ইন্টারনেট না পেয়ে আমি লবিতে রিসেপশনিস্টের কাছে ফোন করলাম। মেয়েটা জানালো যে দুইদিন ধরে এই রুমে ইন্টারনেট কাজ করছে না। বেশ লজ্জিত হয়ে বারবার দুঃখও প্রকাশ করল এর জন্য। আর আমিও সুযোগ পেয়ে এমন একটা অসন্তোষ নিয়ে ফোন রাখলাম যে ওরা ভুলেও আর এই রুম চেক করতে আসার কথা ভাববে না। অপু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আর ভয় নাই। রুমে নেট নাই- এই লজ্জাতেই ওরা আমাদের সামনে মুখ দেখাবে না। আপনি শান্তিতে ঘুমান।’

ভোর ছ’টার মধ্যেই আবার বেড়িয়ে পড়লাম। রোডট্রিপ বলে কথা, যত বেশি সম্ভব রাস্তায় রাস্তায় কাটানো উচিৎ। আবারও একটা গ্রোসারীতে ঢুকে ব্রেড, কলা, কেক এইসব কিনে খেয়ে নিলাম। পেনসাকোলা এসেছিলাম আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে, আর ফেরত যাওয়ার প্ল্যান গালফ্ অব মেক্সিকো’র পাশ দিয়ে। মামুন ভাই হাইওয়েতে ড্রাইভ করার সময়ই কী করে যেন বুঝে যান কোন জায়গায় থামলে সুন্দর একটা বীচ পাওয়া যাবে। সকালটা শুরু হল একটা লেকের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে। লেক না ঠিক; সাগরের ছোট একটা অংশ। দুই বৃদ্ধ মাছ ধরছে, পাশে তাদের কুকুর। তাদের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। অনেক দূরে একটা ভাঙ্গাচোড়া কাঠামো দেখা যাচ্ছিলো। জানা গেল ওটা প্রায় শতাধিক বছরের পুরোনো জেটি। আগে ওখানে স্প্যানিশদের জাহাজ ভিড়তো, মালামাল আসতো। দুই বৃদ্ধের কাছ থেকে আশেপাশের বীচগুলোর অবস্থাণ জেনে নিয়ে আবার আমরা রাস্তায় নেমে পড়লাম।

সকাল আটটার দিকে নেমে পড়লাম নাহ্‌ভার বীচে। মজার ব্যাপার হল ফ্লোরিডার সবগুলো বীচের সামনেই সাইনবোর্ডে লেখা থাকে যে ওটাই ফ্লোরিডার/আমেরিকার/পৃথিবীর সেরা সমুদ্র সৈকত! এখানেও এমনই একটি বাণী দেয়া- ‘ফ্লোরিডার সেরা জিনিসগুলো এই বীচে লুক্কায়িত!’ এই সৈকতেও নেমে দেখি কিছু মানুষ মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে খোঁজাখুঁজি করছে। কি খুঁজছে আর কিইবা পাচ্ছে, গতকাল থেকেই এ প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরছে। কিছুক্ষণ পাড় বরাবর হাঁটাহাঁটি করে কাঠের একটা ব্রীজে উঠলাম যেটা সাগরের দিকে অনেকদূর পর্যন্ত গিয়েছে। ওটাতে উঠতে আবার টিকেট লাগছে। পরে কারণটা বুঝতে পারলাম- আমরা গিয়েছি কেবল দেখতে; আর অন্যরা সবাই গিয়েছে মাছ ধরতে! হরেক রকমের ছিপ-বড়শি নিয়ে এই সাতসকালেই শৌখিন মৎস্যশিকারিরা চলে এসেছে পরিবার নিয়ে। তার উপর সেদিন ছিল রবিবার। ছোট ছোট শামুক টোপ হিসেবে ব্যবহার করে ছোট মাছ ধরছে, আবার সেই ছোট মাছকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে বড়শিটা একটু দূরে ফেলে বড় মাছ ধরছে। সব মাছ যে নিচ্ছে তাও না; পছন্দ না হলে আবার ছেড়ে দিচ্ছে। দেখে মনে হল মাছ পাওয়ার চেয়ে এখানে সময় কাটানোতেই বেশি আনন্দ পাচ্ছে তারা…

    

(নাহ্‌ভার বীচে শৌখিন মৎস্যশিকারিরা)

ওখানে থেকে বের হয়ে যে রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেটাকে আমাদের এই রোডট্রিপের সেরা রাস্তা বলা যেতে পারে। সাঁপের মত এঁকেবেঁকে সামনে চলেছে আর দুইপাশে সাদা রঙের বালি। এত সাদা বলেই এটাকে সুগার-স্যান্ড বলে। আশপাশটা মরুভূমির মত- কোন গাছপালা নেই, দূরে মরীচিকা সৃষ্টি হচ্ছে। হলিউডের মুভিগুলোতে মেক্সিকোর দিকে যাওয়ার সময় যেমন রাস্তা দেখায়, অনেকটা সেরকম! আমরা সমানে দুইপাশের ছবি তুলে যাচ্ছি আর ভাবছি এই সুন্দর রাস্তাটা যেন শেষ না হয়ে যায়। এভাবে ত্রিশ মিনিট ধরে প্রায় বিশ মাইল চলার পর বড় একটা সাইনবোর্ড আর বীচ দেখে গাড়ি পার্ক করলাম। নেমে দেখি সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা ‘ওয়েলকাম টু পেনসাকোলা বীচ’। আমরা হা করে তাকিয়ে রইলাম! তাহলে গতকাল সন্ধ্যায় যেখানে ফটোসেশন করে আসলাম ওটা কোন বীচ ছিল? পরে বাসায় এসে গুগল ম্যাপ্‌সে দেখে বুঝেছি যে প্রথমদিন আমরা আসলে পেনসাকোলা উপসাগরের পাড়ে নেমেছিলাম। আর আজ খুঁজে পেলাম গালফ্ অব মেক্সিকো’র পাড়ে আসল পেনসাকোলা বীচ

(পেনসাকোলা বীচে যাওয়ার পথে…)

 

(পেনসাকোলা বীচ)

বীচে ঢোকার মুখে দেখা গেল পাশাপাশি কয়েকটা গাড়ি পার্ক করে একটা মুসলিম পরিবার আস্তানা গেড়েছে। বোধহয় ওরা সকালেই এসেছে, সারাদিন পানিতে কাটিয়ে এখন ফেরত আসছে গাড়ির কাছে। দলে কয়েকজন পুরুষ, বোরখা পরা কিছু মহিলা আর তাদের ছেলেমেয়ে। মামুন ভাই দূর থেকে তাদেরকে সালাম দিলেন। আমেরিকার একটা বীচে বোধকরি ওরা সালাম আশা করেনি। দাঁড়িওয়ালা বৃদ্ধ একটা লোক বেশ খুশি হয়ে আমাদের কাছে আসলেন। সবার সাথে পরিচিত হয়ে আলাপ জুড়ে দিলেন। জানা গেল এটা মিশরীয় পরিবার। এই বৃদ্ধ তার ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি-নাতনীদের নিয়ে আলাবামাতে থাকেন। প্রায়ই ছুটির দিনগুলিতে এখানে চলে আসেন। স্থানীয় মসজিদের ঈমাম তিনি। ছেলে ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার প্রফেসর। আমরা কেউ মাস্টার্স স্টুডেন্ট, কেউ পিএইচডি স্টুডেন্ট, কেউ রিসার্চার, কেউ ডেন্টিস্ট শুনে খুব খুশি হয়ে গেলেন আর আদর করে পিঠ চাপড়ে দিতে লাগলেন। আলাপের এক পর্যায়ে বললেন, আমরা সমুদ্রস্নান শেষে যেন তাদের সাথে এসে দুপুরের খাবার খাই। খাওয়ার জন্য আমাদেরকে এত করে ধরলেন যে না করতে পারলাম না!

এখানে পানি একদম স্বচ্ছ। ওয়ায়েস ভাই আর থাকতে পারলেন না, পানিতে নেমেই পড়লেন। আমি হাঁটুপানিতে রইলাম, সামনে সারাদিন পড়ে আছে তাই ভিজলে সমস্যা। আধঘন্টা পর এসে দেখি ওরা একটা টেবিলে বাসা থেকে রান্না করে আনা সব আইটেম সাজিয়ে রেখেছে। আমাদেরকে দেখে মেয়েগুলো গাড়ির আড়ালে চলে গেল। টিনেজার হলেও তাদেরকে পরিবার থেকে বোরখা পড়ানোর অভ্যাস করানো হয়েছে। একজন মহিলা (সম্ভবত মেয়েদের মা) আমাদের দিকে প্লেট এগিয়ে দিলেন আর অনুরোধ করলেন আমাদের যা যা ভাল লাগে টেবিল থেকে যেন নিয়ে খাই। রোডট্রিপের শুরু থেকেই আমরা ম্যাকডোনাল্ডস আর সাবওয়ের ভাজাপোড়ার উপরই ছিলাম। তাই গত ত্রিশ ঘন্টায় সবাই বেশ ক্ষুধার্ত, তাছাড়া ঘরের খাবারের প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ তো আছেই। কিন্তু আমরা পাঁচজন যুবক যদি উদরপূর্তি করে খাওয়া শুরু করি তাহলে এই টেবিলের উপর রাখা সব খাবারই শেষ হয়ে যেতে বাধ্য! এই মহিলারা আর মেয়েগুলো তখনো খাওয়া শুরু করেনি, আমাদের কথা ভেবেই। তাই আমরাও তাদের কথা ভেবে এবং সৌজন্য করে সবকিছু একটু একটু করে টেস্ট করে দেখলাম। আইটেমের মধ্যে ছিল মিডল ইস্টের বিখ্যাত রাইস, যার মধ্যে ওরা বাদাম, আখরোট, আলু বুখারা ইত্যাদি রাজ্যের জিনিস মিশিয়ে দেয়। একবার রাইসের মধ্যে সেমাইও পেয়েছিলাম! এখানে রমজান মাসে মসজিদে ইফতারের কল্যাণে অনেক ধরণের মিডল ইস্টের খাবারের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। ওদের আরেকটা বিখ্যাত জিনিস হল সালাদ- এটাও নানাবিধ শাকসবজির মিশ্রণ। তো সেদিন রাইস, সালাদের সাথে ছিল চিকেন আর অনেক রকমের (নাম না জানা) বেক করা আইটেম। সবকিছু একটু একটু করে নিয়েও আমাদের ভালই পেট ভরে গেল। আর খেতে খেতে বৃদ্ধ ঈমাম আর তার ছেলেদের সাথে গল্পগুজব তো চলছেই। চলে আসার আগে আমাদেরকে ফ্লাক্স থেকে বের করে চা’ও খাওয়ালো। খাবার খুব ভাল লেগেছে জানানোর পর মহিলাটি বললেন, ‘মেক দু’আ ফর আস’। আরও কয়েকবার ওদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম। অতি সাধারণ একটা ‘সালাম’ কত সহজে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে তা প্রথমবারের মত উপলব্ধি করলাম সুদূর এই আমেরিকায় এসে!

সেদিন অনেক গরম পড়েছিল, মাথার উপর বিখ্যাত ফ্লোরিডা সান! আধঘন্টা পরপরই কুলার থেকে গেটোরেডের বোতল বের করে সাবাড় করছি। এই জিনিস না থাকলে সেদিন কড়া রোদ মাথায় করে এতগুলো বীচে ঘুরে বেড়ানো অসম্ভব হয়ে যেত। নাহ্‌ভার বীচে থাকতেই স্থানীয় এক আমেরিকানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এদিকে আর কোথায় ভাল বীচ আছে? সে সাথে সাথে বলে উঠল, ‘গো টু ডেস্টিন বীচ। আলটিমেট ফান!’ ওখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম কেন এটা অন্যান্য বীচের চেয়ে ভিন্ন- সমুদ্র সৈকত ছাড়াও এখানে ছোটখাটো একটা জেটির মত করে সারি সারি অনেকগুলো বোট বাঁধা। বোটগুলো বিশাল সাইজের। চাইলেই এখানে থেকে যেকোন একটা ভাড়া করে সাগরে চলে যাওয়া যায়। আমার এক বন্ধু আছে আন্ড্রু, তার কাছ থেকে জেনেছি- মাছ ধরায় দক্ষ এমন কয়েকজন বন্ধু মিলে একদিনের জন্য এই বোটগুলো ভাড়া নেয়, তারপর সারাদিনে যা মাছ পায় সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেয়। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই মাছ কি বাজারে বিক্রি কর?’ জবাবে সে বললো, ‘না সব রান্না করে খাই। তোমাকেও একদিন বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়াব।’ এই বোট, জেটি ছাড়াও ডেস্টিনে স্যুভেনিরের একটা মার্কেটও দেখলাম। মোটামুটি পুরো এলাকাটাই রমরমা।

 

(ডেস্টিন বীচ)

(ইনলেট বীচ)

ডেস্টিন থেকে বের হয়ে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে হেন্ডারসন বীচ, আরও ত্রিশ মাইল দূরে ইনলেট বীচ এবং সেখান থেকে আরও পঞ্চাশ মাইল ড্রাইভ করে মেক্সিকো বীচে নামলাম। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি বীচেই নেমে কেবল পা ভিজানো, একেকটা বীচ স্পর্শ করা যেন গেমের একেকটা পয়েন্ট! তাছাড়া মামুন ভাইয়ের আগ্রহের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। দেখা গেছে আমরা ক্লান্ত হয়ে কিংবা গরমের ভয়ে গাড়ির ভিতর থেকে নামতে চাচ্ছি না; কিন্তু এতটা পথ ড্রাইভ করা সত্ত্বেও বারবার গাড়ি থামিয়ে বীচ পরিদর্শনের উৎসাহে তার বিন্দুমাত্র আলসেমি নেই! মেক্সিকো বীচে ঢোকার মুখেই একজনকে কাছে পেয়ে গেলাম যে কি না গভীর মনোযোগ দিয়ে ঘাসের উপর মেটাল ডিটেক্টর চালাচ্ছে। বয়স পঞ্চাশের উপরতো হবেই। মাথায় কাউবয় হ্যাট, চোখে সানগ্লাস, পরণে সাদা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিছু পেলে?’ জবাবে সে মাথা নেড়ে বললো, ‘নাহ্‌! সিগন্যাল পেলেই খুঁড়ে দেখি কোক-পেপসির বোতলের ক্যাপ।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা কি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আংটি-কানের দুল এগুলো খোঁজো?’ জবাবে আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে বললো, ‘নাহ্‌ ঐগুলোর প্রতি আমার আকর্ষণ নেই।’ জানা গেল তাদের পাঁচজনের একটা দল আছে, কেউ স্থপতি, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উকিল, কেউ ব্যবসায়ী। আর এই ‘মেটাল’ খোঁজা তাদের শখ। কয়েকশ বছর আগে সোনার বার বোঝাই কিছু স্প্যানিশ জাহাজ নাকি গালফ্ অব মেক্সিকোতে ডুবে গিয়েছিল যার হদিস পরে আর পাওয়া যায়নি। তাই ওগুলো সারাজীবন ধরে খুঁজে যাচ্ছে একদল মানুষ। একটা মাত্র সোনার বার মিললেই কোটিপতি!! সেই আশায় বুক বেঁধেই দিনের পর দিন এই কাজ করে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম তাদের ধৈর্যশক্তি দেখে! কথাবার্তার একপর্যায়ে আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে লাফ দিয়ে উঠলো। বললো, ‘আমি জর্জ হ্যারিসনের বিশাল ভক্ত। তাঁর কনসার্ট ফর বাংলাদেশে আমি উপস্থিত ছিলাম। ঐ ক্যাসেটটাও অনেক যত্ন করে রেখে দিয়েছি।’ শুনে মনটা ভাল হয়ে গেল। তার সাথে আমরা কিছু ছবি তুললাম। চলে আসার সময় সে বললো ইদানিং স্প্যানিশ শেখার চেষ্টা করছে।পুরনো কিছু স্প্যানিশ নথিপত্রে ঐ জাহাজগুলোর অবস্থাণ বা গন্তব্য সম্পর্কে লেখা আছে বলে সে মনে করে। আমরাও তার সৌভাগ্য কামনা করে আর একদিন সে কোটিপতি হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে বিদায় নিলাম।

(শৌখিন স্বর্ণশিকারী। পেশায় নৌ-প্রকৌশলী। জর্জ হ্যারিসনের সৌজন্যে বাংলাদেশকে খুব ভাল করে চেনেন এই আমেরিকান। পাশে মামুন ভাই)

এই সবগুলো বীচই পড়ছিল আমাদের বাড়ি ফেরার পথের দিকে, তাই একটু পরপর গাড়ি থামিয়ে নামলেও সমস্যা নেই। তাছাড়া মামুন ভাইয়েরও রেস্ট নিয়ে নিয়ে ড্রাইভ করা হচ্ছে। সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে সেইন্ট যোসেফ পেনিনসুলা স্টেট পার্কে ঢুকে গেলাম। দুইদিন ধরে কেবল সমুদ্র দেখে আমাদের চোখ নতুন কিছু খুঁজছিল। লম্বা লম্বা গাছ আর ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা ধরে গাড়ি চলার সময় মনে হচ্ছিল আফ্রিকার ‘ভীষণ অরণ্য’তে চলে এসেছি! একটা জায়গায় গিয়ে টিকেট কেটে নিতে হল। একদল মানুষ দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা পার্কটার দেখাশুনা করছে; কিন্তু কোথাও কৃত্তিমতার ছোঁয়া নেই! সবকিছু এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, যেকোন সময় যদি আমাদের সামনে একটা বাঘ লাফ দিয়ে চলে আসে তাতেও বোধকরি অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না! চারদিক থেকে বিভিন্ন পাখি আর পোকামাকড়ের ডাক শোনা যাচ্ছে। পার্কটা অনেক বড়, আর অনেক দূর পরপর একটা করে ছোট রেস্ট হাউজ। কেউ চাইলে এগুলো ভাড়া নিয়ে সপ্তাহখানেক কাটিয়ে যেতে পারবে এই জঙ্গলে। জঙ্গলটা ঘুরে দেখার পর আমরা বেশ ক্লান্ত হয়ে যখন গাড়ির ভিতর ঢুকে এসির বাতাস খেতে চাচ্ছি; মামুন ভাই বললেন দেখা এখনো শেষ হয়নি। পার্কের এক স্টাফের সাথে কথা বলে জানলেন, যদি এখান থেকে আরও মিনিট বিশেক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটি, খুব সুন্দর একটা বীচ দেখতে পাব। আবার হাঁটতে হবে শুনে কেউ যেতে চাচ্ছিলো না। মামুন ভাই সবাইকে ফেলেই হাঁটা ধরলেন। লোকটা পারেও- সারাটা রাস্তা একা ড্রাইভ করলেন, ভারী ‘নাইকন ডি নাইনটি’ ক্যামেরা কাঁধে বয়ে নিয়ে পুরো রোড ট্রিপের প্রায় সব ছবি তুললেন, আর সারা রাস্তাব্যাপী তার বিখ্যাত ‘বকরবকর’ তো আছেই। ঝুলিতে উনার অসংখ্য গল্প! পিছে পিছে আমিও হাঁটা ধরলাম। বাকীরাও তখন বাধ্য হয়ে জামাতে শরীক হল। প্রচন্ড গরমের মধ্যে টানা হেঁটে গেলাম, কখনো ঘন জঙ্গল, কখনো মরুভূমির মত তপ্ত সাদা বালি। আবারও বলি, হাতে ঠান্ডা গেটোরেডের বোতল না থাকলে সেদিন বোধহয় পানিশূন্য হয়ে মারাই যেতাম সবাই!

(সেইন্ট যোসেফ পেনিনসুলা স্টেট পার্কের ভেতরের জঙ্গল)

কষ্টকর হন্টন শেষে যা পেলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন! এই বীচটা একদম অন্যরকম। সাদা মসৃণ বালির পাহাড়, সমুদ্রের চক্‌চকে পানি, ভাঙ্গা জাহাজের মত এদিক সেদিক পরে থাকা শুকনো গাছ, হাজার হাজার লাল কাঁকড়া, সারি সারি কাঁশফুল, পরিস্কার নীল আকাশে তুলোর মত ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ, পেছনে অনেক দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ঘন সবুজ জঙ্গল- সব মিলিয়ে অসাধারণ! আমরা ছাড়া আশেপাশে মানুষজনও নেই তেমন, কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। পার্কের অধীনস্থ প্রাইভেট বীচ বলেই এত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে পেরেছে। বুঝলাম সিনেমার শ্যুটিং এর জন্য পরিচালকারা এধরণের জায়গাতেই চলে আসে। পাইরেট্‌স অব দি ক্যারিবিয়ানে ক্যাপ্টেন জ্যাক্‌ স্প্যারো যে একটা দ্বীপে নামে, জায়গাটা অনেকটা তেমনই।

(সেইন্ট যোসেফ পেনিনসুলা স্টেট পার্কসংলগ্ন সমুদ্র সৈকত)

সাগরের পাশেই একটা জায়গা হলুদ কর্ডন দিয়ে ঘেরাও করা দেখে আগ্রহী হয়ে কাছে গেলাম। লেখা আছে একটা কচ্ছপের ডিম পাড়ার সময় হয়েছে, তাই ওখানে বালির একটু নিচেই সে গর্ত করে বাসা করেছে। কর্তৃপক্ষ তাই কচ্ছপটির দেখাশুনার দায়িত্ব নিয়েছে এবং কেউ যেন বিরক্ত না করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে! মনে মনে আরও একবার মুগ্ধ হলাম এদের জীব বৈচিত্রের প্রতি সচেতনতা দেখে। ওখানেই একটা টিলার উপর ওঠার পর বুঝতে পারলাম কেন এটা পেনিনসুলা স্টেট পার্ক। পেনিনসুলা হল ভূখন্ড থেকে সাগরে লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসা স্থলভাগ। এই পেনিনসুলার একপাশে গালফ্ অব মেক্সিকো অন্যপাশে সেইন্ট যোসেফ বে। ঐ টিলার উপর দাঁড়ালেই কেবল এটা দেখা যায়। ফটোসেশন চললো আরও কয়েক দফা। মামুন ভাইয়ের ক্যামেরার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, পুরো রোডট্রিপে প্রায় ছয়শ ছবি তোলা হল।

(ডিম পাড়তে আসা কচ্ছপের জন্য…)

(পেনিনসুলাঃ বামে গালফ্ অব মেক্সিকো আর ডানে সেইন্ট যোসেফ বে)

অন্ধকার হয়ে এলে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। আর ঘোরাঘুরি নয়, বাড়ি পৌঁছুতে হলে আরও সাত ঘন্টা ধরে প্রায় তিনশ মাইল ড্রাইভ করতে হবে। মামুন ভাই স্থির চিত্তে ড্রাইভ করেই চললেন, সাথে চলছে গল্পগুজব। অপু ভাই সুযোগ পেলেই অপি করিমকে টেনে নিয়ে আসছেন, আর মামুন ভাইও পাল্টা অপু ভাইকে মিস্টার এক্সট্রা বলে খেপাতে লাগলেন (ঐ যে হোটেলের পঞ্চম ব্যক্তি…)। ওয়ায়েস ভাই প্রায়ই উদাসীন হয়ে যাচ্ছিলেন, বেশ কয়েকবার দলছুট হয়ে হারিয়েও গেছেন। আবার তাকে খোঁজাখুঁজি করে বের করা হয়। তানভীর ভাই শেষদিকে একটু চুপচাপ রইলেন, বোধহয় কিছুটা ক্লান্ত। রাতের অন্ধকারে বেশ কিছু র‍্যাকূন (ছোট আকারের ভালুক জাতীয় প্রাণী) আমাদের চলন্ত গাড়ির সামনে পরে আত্মাহুতি দিল! দূর থেকে গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে পাশের জঙ্গল থেকে লাফ দিয়ে এসে রাস্তা উপর বসে থাকে। ড্রাইভাররা চাইলেও শেষ মুহূর্তে আর পাশ কাটানো সম্ভব হয়না। বেশ খারাপই লাগলো এগুলোকে আমাদের গাড়ির সামনে এভাবে মরতে দেখে।

(বিভিন্ন বীচে তোলা আরও কিছু ছবি…)

সোমবার ভোর চারটার দিকে আমরা অরল্যান্ডো এসে পৌঁছলাম। ঊইকেন্ড শেষ, তাই সবাই মনে মনে গল্প সাজাচ্ছি আজ ল্যাবে/অফিসে/ভার্সিটিতে বসকে কী বলে ফাঁকি দেয়া যায়। শরীরের উপর দিয়ে যে ধকল গেছে তা কাটতে এক সপ্তাহের ঘুম প্রয়োজন! আটচল্লিশ ঘন্টায় আমরা প্রায় এগারশো মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলেছি! দেখেছি পনরটা সমুদ্র সৈকত!! আমি গাড়িতে বসে আধঘন্টা পরপরই সেলফোন থেকে টুইট করছিলাম কখন কোথায় যাচ্ছি বা কী দেখছি। জানি যে মাসখানেক পরে যখন লিখতে বসব তখন প্রায় কিছুই মনে থাকবে না। আজ লেখার শুরুতেই তাই পুরনো সেই টুইটগুলো আর ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো নিয়ে বসেছিলাম। তারপরেও অনেককিছুই বাদ পড়ে গেছে মনে হচ্ছে। ও হ্যাঁ মজার ব্যাপার হল আমার বন্ধু ম্যাট্‌কে যখন আমাদের এই রোডট্রিপের কথা বললাম সে বললো, ‘আমি বাইশ বছর ফ্লোরিডাতে থেকে যা দেখি নাই, তোমরাতো দুইদিনের তা দেখে ফেললা!!’ মনে মনে বললাম, যাক্‌ আসলেই সফল একটা ট্রিপ দিলাম আমরা। ধন্যবাদ মামুন ভাইকে, সবকিছুর জন্য।

(চলবে)

Advertisements