তিন গোয়েন্দা সিরিজের ‘রাত্রি ভয়ঙ্কর’ বইটার কথা কি কারো মনে আছে? হ্যালোউইনের রাতে পার্টি থ্রো করে ইভা নামে এক মেয়ে কিশোর-রবিন-মুসা সহ সব বন্ধুদের একসাথে খুন করতে চেয়েছিল! আজ অফিসে ঢুকেই হঠাৎ গল্পটা মনে পড়ে গেল। সারারাত ধরে বৃষ্টির পর আজ ভোরবেলাতেও আকাশ অন্ধকার হয়ে ছিল। অফিসে তখনো কেউ আসেনি। আবছা আলোতে কিউবিকলগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি…তখনই চমকে উঠলাম! মাইকের টেবিলের পাশে শিকল দিয়ে বাঁধা একটা ভূত!! দেখতে ভয়ঙ্কর হলেও জোকারের পোষাকে থাকায় পিলে ততটা চমকে ওঠেনি। মনে পড়লো, হ্যালোউইনের বেশি দেরি নেই…
(মাইকের কিউবিকল)
আমেরিকার কর্পোরেট অফিসগুলো বেশ অদ্ভূত! এখানে প্রচন্ড কর্মব্যস্ততা আরে ডেডলাইনের প্রেশার যেমন দেখেছি; তেমনি দেখেছি কাজের পাশাপাশি হাসি-তামাশা, উইকেন্ড উপভোগ করা, ছুটি কাটানো, অফিসে পার্টি বা জন্মদিন পালণ করা প্রভৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ! আমার অফিসে প্রতিদিন নয় ঘন্টা করে সপ্তাহের চারদিন সবাই নাকে-মুখে কাজ করতে থাকে। এরপর আসে ফ্রাইডে- আমেরিকানদের  Second favorite ‘F’ Word! ফ্রাইডেতে হাফ বলে ঐদিন তেমন কেউ আসে না। পাওনা ছুটির মধ্যে ঐ চার ঘন্টা ঢুকিয়ে দিয়ে আড়াই দিনের উইকেন্ডকে করে ফেলে তিন দিন! আর যারা আসে তারাও একে অন্যের কিউবিকলে গিয়ে আড্ডা মারতে থাকে। বসদেরকে দেখা যায় হাফপ্যান্ট পড়ে আসতে, গলফ খেলতে যাওয়ার প্রস্তুতি।
ফ্রাইডের কমন একটা প্রশ্ন হল- উইকেন্ডে প্ল্যান কি? প্রথম প্রথম এই প্রশ্ন শুনে হা করে থাকতাম, তেমন তো কোন প্ল্যান নেই! পরে বুঝলাম উইকেন্ডে এদের কোন ‘ফান অক্টিভিটিস’ না থাকা মানে জীবনের কাছে হাল ছেড়ে দেয়ার লক্ষণ! আস্তে আস্তে আমিও অভ্যস্ত হয়ে গেলাম এই ধরণের প্রশ্নোত্তরে। উত্তর রেডি করেই ফ্রাইডেতে অফিসে চলাফেরা করি- আমরা সবাই মিলে বীচে যাচ্ছি/সবাই ডাউনটাউন যাচ্ছি/বাসায় ডিনার পার্টি থ্রো করেছি/পটলাক/রোডট্রিপ/মুভি দেখা ইত্যাদি। আরও পরে বুঝলাম কিছু একটা বললেই হল। যাই বলি না কেন ওরা চোখ বড় বড় করে বলবে- সাউন্ডস লাইক আ টন অফ ফান!!
এই দীর্ঘ উইকেন্ডে কাজ তো দূরের কথা, একজন আরেকজনকে কাজ সংক্রান্ত ইমেইলও করবে না। এরকম গা এলিয়ে চলার পর সোমবার কাজে ফেরাটা কষ্টকর। এটা সপ্তাহের সবচেয়ে ঘৃণিত দিন। অফিসে কারও মুখে টু শব্দটি থাকে না, যে যার মত গম্ভীরভাবে কাজ করতে থাকে। তবে কারো সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতে ভুলে না- হাউ ওয়াজ উইকেন্ড? মনে আছে একবার বস জিজ্ঞেস করল উইকেন্ডে ক্রেজি কিছু করেছি কীনা। আমার তেমন কিছু মনে না আসাতে বললাম, কয়েকজন বন্ধু মিলে হাঁস রান্না করে খেয়েছি। তারপর কিভাবে অনেক খুঁজে পেতে হাঁসের মাংস জোগাড় করে, নানাবিধ দেশি মসলা দিয়ে হাঁস রান্না করেছি তার বর্ণনা দেয়ার পর বস অভিভূত হয়ে স্বীকার করলেন যে, নাহ আমার উইকেন্ডে অনেক ফান হয়েছে।
তো যা বলছিলাম, সোমবারকে সবাই এতই ভয় পায় যে আগের রাত থেকেই সবার মুখ চোখ শুকিয়ে থাকে। আমেরিকার পুরো সপ্তাহটা কেমন তা বোঝানোর জন্য এই কৌতুকটিই যথেষ্ট-
My week is basically:
Monday
Monday #2
Monday #3
Monday #4
Friday Saturday
Pre-Monday
নানাবিধ কাজের ইমেইলের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায় প্রচন্ড মজার ইমেইল। একবার অফিসের বস সবাইকে গণ ইমেইল করলেন যে নিচে সিড়ির কাছে তার পুরোনো সাইকেলটা রাখা আছে, কেউ চাইলে নিয়ে নিতে পারে। সাথে সাথেই জ্যাক উত্তর দিলে যে সে নিতে আগ্রহী। আরও মিনিট দশেক পরে দেখা গেল জ্যাকের গণ ইমেইলঃ ‘আমার কাছে একটা সাইকেল আছে। দাম মাত্র ৫০ ডলার।’ (সাথে ছবি অ্যাটাচ করা)।
আরেকবার বেশ সিনিয়র একজন ইমেইল করল যে- ‘My Outlook email or Instant message nothing is working. Please utilize other means to communicate with me.’ উত্তরে একজন নিচের ছবি দিয়ে বললো- Will do.
দেখতে দেখতে এই অফিসে আমার এক বছর হয়ে গেল। প্রথম দিনটার কথা এখনো মনে পড়ে। সকাল থেকেই খুব সময় নিয়ে রেডী হলাম। ভালমতন সব দরকারী কাগজপত্র চেক করলাম যেন কিছু বাদ না পড়ে বা চাইলেই দেখাতে পারি। হাতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে অফিসে পৌঁছলাম। সেদিন আমাদের এইচ. আর. জেনিফার পুরো অফিস ঘুরিয়ে দেখাবে এবং সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। মনে মনে অতিরিক্ত সাবধান হলাম যে সবকিছু পারফেক্ট হওয়া চাই।
অতিরিক্ত সাবধান হতে গেলেই বিপত্তি বাঁধে। জেনিফার যখন সবে আমাকে নিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, তখন খেয়াল হল আমি মানিব্যাগ সকালে নাস্তা করার সময় রেস্টুরেন্টে ফেলে এসেছি! কিছুক্ষণ ভাবলাম যে এটা বলা কি এখন ঠিক হবে? পরে লজ্জিত মুখে বলেই ফেললাম জেনিফারকে যে আমি এখনি গিয়ে দেখে আসছি ওটা রেস্টুরেন্টেই আছে কীনা। ও বললো তাড়াতাড়ি যাও, তাড়াতাড়ি যাও।
তখনো আমার গাড়ি ছিলনা, তাই হেঁটেই রওনা দিলাম। মিনিট দুয়েক পরে পাশে তাকিয়ে দেখি জেনিফার গাড়ি নিয়ে হাজির, মাঝ রাস্তা থেকেই আমাকে তুলে নিতে নিতে বললো- ‘আশ্চর্য! তুমি বলবে না যে তুমি হেঁটে যাচ্ছ! স্টিভ তোমাকে জানালা দিয়ে দেখতে পেয়ে আমাকে মজা করে বললো যে কামরুল পালাচ্ছে কেন? তুমি কি তাকে প্রথম দিনেই ভয় পাইয়ে দিয়েছ?’
ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল- গিয়ে দেখি মানিব্যাগ ওদেরই একজন বৃদ্ধা ওয়েট্রেস সজত্নে তুলে রেখেছে। ওকে কিছু বকশিশ দিয়ে বিদায় নিলাম। ওদিকে জেনিফার আমার প্রথম দিনের বিপত্তি দেখে হাসতে হাসতে শেষ। আমি ওকে বললাম একদিন এই ঘটনাটা আমি ব্লগে লিখবো। এটা স্মরণীয় একটা দিন আমার জন্য।
অফিসে সবার সাথে পরিচয়ের শেষে বসের রুমে গেলাম। নাম অ্যালেক্স, মাথায় টাক। বয়স ষাটের উপর। রুম ভর্তি করে রেখেছে বিভিন্ন দেশ থেকে আনা স্যুভেনিরে। আছে বেশ কিছু প্রাচীন ভাস্কর্য। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। একসময় বললাম, এগুলোর অ্যানটিক ভ্যালু নিশ্চয়ই অনেক। অ্যালেক্স বাতাসে হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল, আরে ধুর সবগুলো নকল, প্লাস্টিকের। আমি বললাম, ওহ…রুম থেকে বের হওয়ার সময় পেছন থেকে বুড়ো আবার বলে উঠলো, সবাইকে ওটাই বলি, যেন চুরি না হয়ে যায়…আমি আর জেনিফার হো হো করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলাম।
(চলবে)
Advertisements